ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, জাতীয় বাজেটের পাশাপাশি একটি স্পষ্ট অর্থনৈতিক কৌশল ও সংস্কারের রূপরেখা ঘোষণা না করলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। তাঁর মতে, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয় বরং একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনার মাধ্যমেই সংস্কার কার্যক্রমকে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য করা সম্ভব।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর একটি হোটেলে প্রথম আলো আয়োজিত ‘সংকটে বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও আসন্ন বাজেটের চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশদ আলোচনা করেন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের উচিত একটি সুসংগঠিত নীতিপত্রের মাধ্যমে সামগ্রিক অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা পরিষ্কার করা। তাঁর মতে, বাজেট একা কোনো সমস্যার সমাধান নয়, বরং এটি বৃহত্তর অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, আসন্ন বাজেট কঠিন সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনগণের উচ্চ প্রত্যাশার মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরির পরীক্ষা হবে। একদিকে মূল্যস্ফীতি, ঋণ ব্যবস্থাপনা, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের শর্ত পূরণ এবং বৈদেশিক অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা ও জনগণের প্রত্যাশার চাপও বাড়ছে। এই দুই দিক সামলানোই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, সরকার বর্তমানে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কর্মসূচির কাঠামোর মধ্যেই কাজ করছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক অর্থায়ন ও আর্থিক শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় শুধু অর্থমন্ত্রী একা নয়, পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের সমন্বিত কার্যক্রমই ফল নির্ধারণ করবে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে তিনি বলেন, নীতিনির্ধারকদের প্রথমেই স্থিতিশীলতার অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। মূল্যস্ফীতি, বিনিময় হার বা সুদের হার—কোনটিকে আগে স্থিতিশীল করা হবে, সেই সিদ্ধান্ত স্পষ্ট হওয়া জরুরি। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে মূল্যস্ফীতিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এটি সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তা, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে জড়িত।
তিনি বাজেট ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের চার শতাংশের মধ্যে রাখার পরামর্শ দেন। এটিকে তিনি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন। তবে এর জন্য রাজস্ব আহরণ, ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে বলেও মন্তব্য করেন।
ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বৃদ্ধি এবং কর প্রশাসনের দক্ষতা উন্নয়ন জরুরি। বর্তমানে কর ছাড়ের পরিমাণ মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ছয় শতাংশ, যার অনেক অংশ পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, ভর্তুকি, কর ছাড় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বড় ব্যয়ের বিষয়গুলো সতর্কভাবে পর্যালোচনা করা দরকার।
পুঁজিবাজার শক্তিশালী করার জন্য লাভজনক রাষ্ট্রীয় ও বহুজাতিক কোম্পানির শেয়ার ছাড়ার বিষয়েও তিনি সুপারিশ করেন। এতে রাজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বৈষম্য কমানোর বিষয়ে তিনি সম্পদ কর ও উত্তরাধিকার কর চালুর পক্ষে মত দেন। তাঁর মতে, শুধু আয়করের মাধ্যমে বৈষম্য কমানো সম্ভব নয়। সম্পদ ও উত্তরাধিকারের ওপর কর আরোপের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। পাশাপাশি অনুপার্জিত আয়ের ওপর ন্যায্য কর কাঠামো তৈরি করা জরুরি।
তিনি বাজেট ঘোষণার সঙ্গে একটি পৃথক কৌশলপত্র প্রকাশের দাবি জানান। তাঁর মতে, এতে বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা আসবে। পরিশেষে তিনি বলেন, বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি ও সংস্কারের একটি রাজনৈতিক বার্তা।

