আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, গবেষক ও বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, আসন্ন বাজেট হতে হবে সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তিদায়ক এবং ব্যবসায়ীদের জন্য সহায়ক।
তাঁরা আরও বলেন, উচ্চ সুদের চাপ কমানো জরুরি। একই সঙ্গে করের বোঝা হ্রাস এবং কর আদায়ে ব্যবসায়ীদের হয়রানি কমানোর বিষয়েও জোর দেওয়া হয়। এই মতামত উঠে আসে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায়। গত বৃহস্পতিবার প্রথম আলো আয়োজিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক এই আলোচনায় বিভিন্ন শ্রেণির অংশীজন অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে অতিথিদের স্বাগত জানান প্রথম আলোর সম্পাদক। পুরো অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর হেড অব অনলাইন শওকত হোসেন।
অর্থনীতির দিক পরিবর্তনের আশ্বাস:
আলোচনায় অংশ নিয়ে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। ধীরে ধীরে বাংলাদেশকে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে রূপ দেওয়াই সরকারের লক্ষ্য। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির হার কত হলো, সেটি মুখ্য নয়। সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এলো সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, এমন প্রবৃদ্ধির কোনো মূল্য নেই, যা মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারে না।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, তিনি এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে চান যেখানে কিছু গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সব নাগরিকের সমান অংশগ্রহণ থাকবে। অর্থনীতির সুফল যেন সবার কাছে পৌঁছায়, সেটিই সরকারের লক্ষ্য। তিনি জানান, সৃজনশীল অর্থনীতিকে আগামী অর্থবছর থেকে মূলধারায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ জন্য একটি পৃথক তহবিল গঠন করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, এমন একটি করনীতি প্রণয়নের কাজ চলছে যেখানে করদাতারা নিজেদের সম্মানিত নাগরিক হিসেবে অনুভব করবেন। কর ব্যবস্থা যেন খাতভিত্তিক চাপ ও বিভাজনের কাঠামো না হয়ে ন্যায়সঙ্গত ও স্বচ্ছ ব্যবস্থায় রূপ নেয়, সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ চলছে। ব্যাংক খাত নিয়ে তিনি বলেন, ব্যাংকের মূল কাজ হবে চলতি মূলধন সরবরাহ এবং সাধারণ ঋণ প্রদান। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বড় প্রকল্পেও ব্যাংক একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে ঋণ দিচ্ছে, যা অদক্ষতার উদাহরণ।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, সরকার কেন সব খাতে অর্থ দেবে। বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান চাইলে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করতে পারে।
আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, খুব কম সুদের ঋণের জন্য সব সময় বাইরে নির্ভর না করে দেশের ভেতরেই শক্তিশালী অর্থায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আরও বলেন, প্রবৃদ্ধির হিসাব নয়, মানুষের জীবনমানের উন্নয়নই আসল বিষয়। যে প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনে বাস্তব পরিবর্তন আনে না, সেই প্রবৃদ্ধির কোনো অর্থ নেই। তিনি জানান, আগামী দুই বছরের মধ্যে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র গঠনের পথে সরকার এগিয়ে যাবে।
বড় অঙ্কের অর্থায়নের ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রী পুঁজিবাজার ব্যবহারের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে দুই হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার বদলে পুঁজিবাজার থেকেই অর্থ সংগ্রহ করা উচিত। তাঁর মতে, পুঁজিবাজার বর্তমানে দুর্বল অবস্থায় থাকলেও দ্রুত এটিকে কার্যকর করা হবে।
তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজার থেকে অর্থ নিলে প্রতিষ্ঠানকে তাৎক্ষণিকভাবে সুদ দিতে হয় না। প্রতিষ্ঠান লাভ করলে তখনই লভ্যাংশ দেওয়া হয়। অন্যদিকে বন্ড বাজার থেকেও তুলনামূলক কম সুদে ঋণ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যবসার খরচ কমানো সম্ভব হবে।
সুশাসন বনাম সংস্কার প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি অনেকটা আগে ডিম না মুরগি—এ ধরনের দ্বন্দ্বের মতো। তবে সরকার সার্বিক সংস্কারের পথে এগোচ্ছে। তিনি আরও জানান, এখন আর বহু দপ্তরের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে না। প্রয়োজন হলে একক জায়গা থেকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুমোদন দেওয়া হবে।
শুল্ক বিভাগ ও বন্দরের কার্যক্রম প্রসঙ্গেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, সবকিছু ধাপে ধাপে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় নিয়ে যাওয়া হবে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অনেক সময় অতিরিক্ত খরচ শুরু হয়, যেখানে নানা ধরনের মাশুল দিতে হয়। এতে পণ্যের ব্যয় বাড়ে। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রায় দশ শতাংশ পর্যন্ত খরচ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো এসব অতিরিক্ত খরচ কমিয়ে ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয় হ্রাস করা।
বাজেটে ভারসাম্যের জন্য ‘নোঙর’ প্রয়োজন: দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য
আগামী অর্থবছরের বাজেটকে ভারসাম্য রক্ষার একটি কঠিন পরীক্ষা হিসেবে অভিহিত করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হওয়া উচিত আগামী বাজেটের মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, কাঠামোগত সংস্কারের ঘাটতি, প্রতিকূল বৈশ্বিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের শর্ত এবং জনগণের উচ্চ প্রত্যাশা—এই চার ধরনের চাপের মধ্যে বাজেট প্রণয়ন করতে হচ্ছে অর্থমন্ত্রীকে। এ পরিস্থিতিতে বড় বাজেট ঘাটতি এবং রাজস্ব ঘাটতি দেখা দেবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ভঙ্গুর অর্থনীতি থেকে উন্নয়নের পথে ফিরতে সামষ্টিক অর্থনীতির কাঠামোয় একটি স্থিতিশীল ‘নোঙর’ প্রয়োজন। তবে বাজেট ঘাটতি কমাতে গিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ যেন কমে না যায়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। তিনি আরও বলেন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে স্বল্প বরাদ্দ দিয়ে প্রকল্পগুলোকে শুধু টিকিয়ে রাখার প্রবণতা রয়েছে, যা কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না।
কর কাঠামো নিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে করপোরেট আয়করে বিপুল পরিমাণ ছাড় দেওয়া হচ্ছে, যার পরিমাণ প্রায় পঁচিশ হাজার কোটি টাকার বেশি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচিত এসব করছাড় পুনর্মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় জায়গাগুলো পর্যালোচনা করা। বিদ্যুৎ খাতসহ বিভিন্ন খাতের করছাড় পুনর্বিবেচনারও প্রয়োজন আছে বলে তিনি মত দেন। পাশাপাশি আয়করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে সম্পদ কর এবং উত্তরাধিকার কর চালুর প্রস্তাব দেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর একটি বড় সম্ভাবনা রয়েছে সরকারের মালিকানাধীন লাভজনক ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বাজারে আনার মাধ্যমে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হতে পারে কৃষি: হোসেন জিল্লুর রহমান
আগামী বাজেট প্রণয়নে জনপ্রিয়তা অর্জনের চেয়ে সফলতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও পিপিআরসির চেয়ারপারসন হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রীকে জনপ্রিয় হিসেবে নয়, বরং সফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের প্রত্যাশা হলো একটি স্বস্তিদায়ক বাজেট। উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপই এখন সময়ের দাবি। বিনিয়োগকারী থেকে সাধারণ মানুষ—সবাই আস্থার সংকটে রয়েছে। বাজেটের মাধ্যমে সেই আস্থা পুনরুদ্ধার করা জরুরি। হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, অর্থনীতির প্রায় সব খাতেই সংকট বিদ্যমান। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাজেট বাস্তবায়নের দুর্বলতা।
তিনি মনে করেন, মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে নতুন চালক প্রয়োজন। বর্তমানে প্রবৃদ্ধির প্রধান ভরসা সেবা খাত হলেও ভবিষ্যতে কৃষি খাত গুরুত্বপূর্ণ চালক হয়ে উঠতে পারে। তিনি আরও বলেন, মানুষ এখন আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষায় হিমশিম খাচ্ছে। তাই বাজেটে মানুষের আর্থিক সামর্থ্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেই অর্থ কার্যকরভাবে ব্যয়ের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই ফল আসবে না, বাস্তব প্রয়োগই মূল বিষয়।
বাজেটে পাঁচ বছরের পরিকল্পনার দাবি:
বাজেটকে শুধু এক বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব না ভেবে পাঁচ বছরের পরিকল্পনা হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের প্রফেসরিয়াল ফেলো সেলিম জাহান। তিনি বলেন, বাজেটের একটি সুস্পষ্ট উন্নয়ন দর্শন থাকা জরুরি। তিনি আরও বলেন, বাজেটের ভারসাম্য এমনভাবে রাখতে হবে, যাতে মানুষের জীবনের ভারসাম্য নষ্ট না হয়। ভর্তুকি কমালে জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব পড়তে পারে, তাই এ ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
সেলিম জাহান বলেন, একদিকে সংস্কার, অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। তাঁর মতে, এমন সংস্কার দরকার যা বাস্তবায়নযোগ্য এবং সামাল দেওয়া সম্ভব। তিনি বলেন, কর আদায় বাড়াতে হবে এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা আনতে হবে। একই সঙ্গে স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক গতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, বাজেটে শুধু জনপ্রত্যাশা নয়, বরং জনগণের বাস্তব প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কিছু সিদ্ধান্ত হয়তো সবাই পছন্দ নাও করতে পারে, তবে সে জন্য আগে থেকেই জনগণকে প্রস্তুত করতে হবে। অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং নারীর উন্নয়নকে বাজেট আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়ারও আহ্বান জানান তিনি।
উচ্চ সুদে পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা:
টি কে গ্রুপের পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার বলেন, দেশে কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক পার্থক্য আরও স্পষ্ট হওয়া উচিত। তিনি বলেন, উচ্চ সুদের কারণে বাংলাদেশ চীন, ভিয়েতনাম ও ভারতের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, এসব দেশে সুদের হার অনেক কম, ফলে ব্যবসার খরচও কম।
তিনি আরও বলেন, দেশে গ্যাস সংকট ও বিদ্যুতের উচ্চ দাম ব্যবসার ওপর চাপ তৈরি করছে। বিদ্যুতের দাম প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। মোস্তফা হায়দার অগ্রিম আয়কর ও মূল্য সংযোজন কর ফেরত না পাওয়ার বিষয়টিকে ব্যবসার জন্য বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের কারণে সংযোগশিল্প গড়ে না ওঠার অভিযোগও করেন তিনি।
ওষুধ খাতে কর ও শুল্ক চাপ কমানোর দাবি:
ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সিমিন রহমান ওষুধশিল্পের কাঁচামালে অগ্রিম আয়কর কমানোর দাবি জানান। তাঁর মতে, বর্তমানে এই করহার বেশি হওয়ায় ব্যবসায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, কর ব্যবস্থাকে আরও ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করা প্রয়োজন, যাতে কর আদায় সহজ হয় এবং স্বচ্ছতা বাড়ে।
তিনি আরও বলেন, ওষুধশিল্পে বন্ডেড সুবিধা চালু করা উচিত। পোশাক খাতের মতো এই খাতকেও রপ্তানিমুখী সুবিধা দেওয়া দরকার। গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে কর ছাড় দেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন ওষুধ উদ্ভাবনে দীর্ঘ সময় লাগে, অথচ শুরু থেকেই করের চাপ বহন করতে হয়। সিমিন রহমান আরও বলেন, আর্থিক খাতের সংস্কার এখন সময়ের দাবি। তবে এটি সহজ নয়, তবুও সঠিক দিকেই এগোতে হবে।
তিনি পানীয় শিল্পের করহার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশে এই খাতে করহার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি, যা প্রতিযোগিতায় বাধা সৃষ্টি করছে।
বিনিয়োগ পরিবেশ এখন ভাঙা ঘর: মাসরুর রিয়াজ
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের আঠারো মাসে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। তাঁর মতে, দেশের বর্তমান বিনিয়োগ পরিবেশ এখন একটি ভাঙা ঘরের মতো অবস্থায় আছে। তিনি বলেন, এই ঘর মেরামত না করে যদি বিনিয়োগকারী বা ভাড়াটে আনা হয়, তারা হতাশ হয়ে ফিরে যাবে। গত আঠারো মাসে কিছু বিচ্ছিন্ন সংস্কার হলেও তা বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এসব ছোটখাটো পদক্ষেপকে বড়জোর তুচ্ছ ধরনের সংস্কার বলা যায়, যা দিয়ে বিনিয়োগের মূল বাধা দূর করা সম্ভব নয়।
মাসরুর রিয়াজ বলেন, বর্তমানে বিনিয়োগ পরিস্থিতি তলানিতে নেমে গেছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। বিনিয়োগ সচল না হলে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য এবং উৎপাদনশীলতা সবই বাধাগ্রস্ত হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সময় একটি বহুমাত্রিক সংকটকাল। অর্থনীতির গতি ধীর হয়ে গেছে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা বিনিয়োগের জন্য একটি অশনিসংকেত।
বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অনেক চালু পোশাক কারখানাও এখন বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসা থেকে নিরাপদভাবে বের হয়ে যেতে চাইছেন। এসব কারখানা টিকিয়ে রাখতে বিশেষ তহবিল গঠন এবং প্রস্থানপ্রত্যাশী উদ্যোক্তাদের জন্য বাজেটে আলাদা ব্যবস্থা রাখার দাবি জানান তিনি।
তিনি অগ্রিম আয়কর ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, মুনাফা না হলেও বিক্রির ওপর কর দিতে হচ্ছে, যা উদ্যোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রসারে ব্যাটারির ওপর শুল্ক প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানান তিনি।
এইচএসবিসি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উর রহমান বলেন, চিকিৎসার অভাবে শিশুদের মৃত্যু দেখলে নাগরিক হিসেবে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়। তিনি বলেন, আগামী বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তিনি আরও বলেন, দেশের বেশির ভাগ পারিবারিক ব্যবসা সম্পদ তৈরি করলেও নগদ অর্থ সংকটে রয়েছে। অনেক ব্যবসা এখন ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে, ফলে সুদের হার তাদের জন্য সবচেয়ে বড় চাপের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়াতে অফশোর ব্যাংকিং ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনার আহ্বান জানান।
মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজার কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। তাঁর মতে, বিপুল জনগোষ্ঠী মাত্র কয়েকটি গ্রুপের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা উদ্বেগজনক। তিনি শুল্কায়ন ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সঙ্গে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ট্যারিফ মূল্যের বড় পার্থক্য রয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের অভিযোগের মুখে পড়ছেন।
তিনি জিরা ও এলাচির মতো নিত্যপণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর মতে, এসব কর সাধারণ ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, বড় করপোরেট গোষ্ঠীর দাপটে ছোট রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারছেন না। কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান বেকারি ও রেস্তোরাঁ খাতের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং বন্ড সুবিধায় আনা কাঁচামাল ব্যবহার করে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি জানান, দেশে প্রায় চার লাখ আশি হাজার রেস্তোরাঁ থাকলেও ভ্যাট নিবন্ধিত মাত্র প্রায় দশ হাজার।
ইমরান হাসান বলেন, একটি রেস্তোরাঁ চালু করতে তেরো থেকে চৌদ্দটি সরকারি দপ্তরের অনুমোদন লাগে। বিভিন্ন লাইসেন্স ও ছাড়পত্রের জটিলতায় ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হন। তিনি রেস্তোরাঁ খাতের জন্য আলাদা তহবিল, সহজ শর্তে ঋণ এবং একক সেবা কেন্দ্র চালুর দাবি জানান।

