উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকঋণের বাড়তি সুদহার, ডলার সংকট এবং দীর্ঘস্থায়ী বিনিয়োগ স্থবিরতার মধ্যেই ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য বড় বিনিয়োগ লক্ষ্য নির্ধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। নতুন বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২১ লাখ ৪৫ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই বিনিয়োগ লক্ষ্যের বড় অংশ আসবে বেসরকারি খাত থেকে। জিডিপির ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ বা প্রায় ১৭ লাখ ১১ হাজার ৭২ কোটি টাকা বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে আসার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারি খাত থেকে বিনিয়োগ ধরা হয়েছে জিডিপির ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর লক্ষ্যেই বিনিয়োগে বড় ধাক্কা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এ জন্য অবকাঠামো, জ্বালানি, লজিস্টিকস, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলভিত্তিক শিল্পায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কর ছাড়, নীতিগত সহায়তা এবং ব্যবসা সহজীকরণ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের উচ্চ বিনিয়োগ লক্ষ্য অর্জন কঠিন। তাদের যুক্তি, বিনিয়োগ বাড়ার প্রধান শর্ত হলো স্থিতিশীল নীতি পরিবেশ এবং সহজ ঋণপ্রবাহ। কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কারণে বাজারে সুদহার বেড়েছে, শিল্পঋণ ব্যয়বহুল হয়েছে এবং বেসরকারি ঋণপ্রবাহ ধারাবাহিকভাবে কমছে। এতে নতুন বিনিয়োগে অনাগ্রহ তৈরি হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, সংকোচনমূলক নীতির কারণে ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, কিন্তু অর্জিত হয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ডিসেম্বর পর্যন্ত সংশোধিত লক্ষ্য ৭ দশমিক ২ শতাংশ হলেও অর্জন দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে এই প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশে নেমে আসে এবং মার্চে তা আরও কমে ইতিহাসের সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে পৌঁছায়। তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক
অর্থনীতিবিদ ও সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বড় বিনিয়োগ লক্ষ্য ইতিবাচক হলেও তা বাস্তবায়ন নির্ভর করবে অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর। তার মতে, উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে কার্যকর বিনিয়োগ অন্তত জিডিপির ৩০ শতাংশের বেশি হওয়া প্রয়োজন, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অর্জন কঠিন। তিনি আরও বলেন, শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নীতিগত পূর্বানুমানযোগ্যতা, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং দ্রুত সংস্কার ছাড়া বড় বিনিয়োগ আসবে না।
দীর্ঘদিন ধরেই বেসরকারি বিনিয়োগ কাঙ্ক্ষিত গতিতে বাড়ছে না। উচ্চ সুদহার, ব্যাংক খাতের চাপ, সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণ এবং ডলার সংকট উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি অনিশ্চয়তা ও নীতিগত সমন্বয়হীনতার কারণে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগের বদলে বিদ্যমান শিল্প টিকিয়ে রাখাকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, শুধু বড় লক্ষ্যমাত্রা নয়, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। তথ্যসূত্র: ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি
অন্যদিকে কিছু ইতিবাচক দিকও দেখা যাচ্ছে। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই দেশে সামান্য হলেও বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে নিট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ ৩৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ বেড়ে ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ২০২৪ সালে ছিল ১ দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার।
বিদেশি বিনিয়োগ আরও বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, বিশ্বজুড়ে বড় বিনিয়োগকারী ও ফান্ড ম্যানেজাররা এখন বাংলাদেশে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তার ভাষায়, জেপি মরগ্যানসহ শীর্ষ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে আসতে চায়। হংকং ও লন্ডনে বাংলাদেশকেন্দ্রিক ফান্ড গঠনের পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় বন্ড বাজার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

