বাংলাদেশের স্থবির অর্থনীতিকে সচল করতে, বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা আবার চালু করতে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধা পাবেন।
গতকাল শনিবার (২৩ মে) দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি জানান, অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চক্রবিরোধী নীতিগত সহায়তার পথে এগোচ্ছে। অর্থাৎ যখন বেসরকারি বিনিয়োগ ও বাজার চাহিদা কমে যায়, তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিশেষ আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর উদ্যোগ নেয়। নতুন এই প্রণোদনা প্যাকেজ সেই লক্ষ্যেই নেওয়া হয়েছে।
গভর্নর আরও বলেন, ঘোষিত তহবিলে সরকার ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি দেবে। ফলে উদ্যোক্তারা মাত্র ৭ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন। মোট ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা দেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এবং বাকি ১৯ হাজার কোটি টাকা থাকবে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই উদ্যোগের মাধ্যমে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ২৫ লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
কোন খাতে কত বরাদ্দ:
প্রণোদনা প্যাকেজে সবচেয়ে বড় অংশ রাখা হয়েছে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত পুনরায় চালুর জন্য। এ খাতে বরাদ্দ ২০ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ দিয়ে কাঁচামাল আমদানি, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা, ইউটিলিটি বিল, উৎপাদন ব্যয় এবং রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন করা যাবে। এ খাতে প্রায় দুই লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো, ছোট ও মাঝারি শিল্প খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকা। এই অর্থ উৎপাদন কার্যক্রম, শ্রমিকের মজুরি এবং রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হবে। এ খাতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির আশা করা হচ্ছে।
কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকা। কৃষিপণ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং গ্রামীণ আয় বৃদ্ধিতে এই অর্থ ব্যয় করা হবে। এ খাতে প্রায় ৯ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া রপ্তানি বহুমুখীকরণে ৩ হাজার কোটি টাকা এবং উত্তরবঙ্গে কৃষি হাব গড়ে তুলতে আরও ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমেও একাধিক খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— প্রি-শিপমেন্ট ঋণ সুবিধায় ৫ হাজার কোটি টাকা, কুটির ও মাইক্রো উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকা, চামড়া ও জুতা রপ্তানি খাতে ২ হাজার কোটি টাকা, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি রপ্তানিতে ২ হাজার কোটি টাকা, প্রবাসী কর্মসংস্থানে ১ হাজার কোটি টাকা, বেকার যুবকদের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা, গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ১ হাজার কোটি টাকা, পরিবেশবান্ধব ও সবুজ প্রকল্পে ১ হাজার কোটি টাকা, সৃজনশীল অর্থনীতিতে ৫০০ কোটি টাকা এবং স্টার্টআপ খাতে ৫০০ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, এসব তহবিল বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পিকেএসএফ, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং আনসার-ভিডিপি ব্যাংকের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এই প্রণোদনা কর্মসূচির ফলে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে, বন্ধ শিল্পকারখানা আবার চালু হবে এবং উৎপাদন কার্যক্রমে গতি ফিরবে। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান বাড়ায় মানুষের আয় বৃদ্ধি পাবে এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদাও শক্তিশালী হবে। ফলে বাজারে অর্থ প্রবাহ বাড়বে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

