বাংলাদেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আগামী পাঁচ বছরে অন্তত ১০ বিলিয়ন ডলারের বিদেশি ঋণ সহায়তা নিতে চায় সরকার।
এ লক্ষ্য পূরণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে নতুন করে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে আগামী অর্থবছরের বাজেট সহায়তা হিসেবে জুনের মধ্যেই অন্তত ৩ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ সফরে এসে এডিবির প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা আগামী পাঁচ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান–এর সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি এই প্রতিশ্রুতি দেন।
অন্যদিকে বর্তমান ঋণ কর্মসূচির পরিবর্তে আইএমএফের সঙ্গে নতুন তিন বছর মেয়াদি সংস্কারভিত্তিক কর্মসূচিতে যেতে চায় সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, নতুন এই কর্মসূচির আওতায় আইএমএফ থেকে আরও ৫ থেকে ৬ বিলিয়ন ডলার ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্ক–এর মধ্যে ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থা, চলমান আইএমএফ কর্মসূচির অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কাঠামোগত সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে চলমান আইএমএফ কর্মসূচি যে প্রেক্ষাপটে নেওয়া হয়েছিল, পরবর্তীতে দেশীয় বাস্তবতা, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
তিনি জানান, সরকার সংস্কার কার্যক্রম থেকে সরে আসতে চায় না। বরং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়নে আগ্রহী। এ কারণেই নতুন সরকারের অধীনে বাস্তবভিত্তিক ও অগ্রাধিকার নির্ধারিত একটি নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা চলছে।
আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্ক বাংলাদেশের সংস্কার প্রচেষ্টাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছেন। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে সংস্থাটির ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। দুই পক্ষই দ্রুত নতুন কর্মসূচি প্রণয়নের বিষয়ে একমত হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন কর্মসূচি চূড়ান্ত করতে আগামী জুলাই বা আগস্টে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফর করতে পারে। তখন ঋণের পরিমাণ, শর্ত ও সময়সীমা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটের মধ্যে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ আইএমএফের ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। পরে ২০২৫ সালে এর পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলার করা হয়। এখন পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে বাংলাদেশ ৩৬৪ কোটি ডলার পেয়েছে। বাকি রয়েছে আরও ১৮৬ কোটি ডলার।
তবে রাজস্ব আদায়, বিনিময় হার ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক খাত সংস্কারে ধীরগতির কারণে আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ জানিয়ে আসছিল। বিশেষ করে অভিন্ন ভ্যাট হার চালু, কর অব্যাহতি কমানো, বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নির্ধারণ, বিদ্যুৎ ও সারের ভর্তুকি হ্রাস, ব্যাংক খাত সংস্কার এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পুনর্গঠন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য ছিল।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মনে করছেন, আইএমএফের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এডিবি, এআইআইবি ও জাইকার মতো সংস্থার কাছ থেকে বাজেট সহায়তা পাওয়াও সহজ হয়।
সরকার আশা করছে, নতুন কর্মসূচির অগ্রগতি সন্তোষজনক হলে বহুপক্ষীয় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে অতিরিক্ত সহায়তা পাওয়া আরও সহজ হবে।
এডিবি জানিয়েছে, আগামী পাঁচ বছরে সমন্বিত প্রবৃদ্ধিভিত্তিক নেটওয়ার্ক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দেওয়া হবে। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নয়ন এবং সুষম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা।
এই প্যাকেজের আওতায় প্রতি বছর গড়ে ১ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করা হবে। এটি এডিবির নিয়মিত ঋণ কর্মসূচির সঙ্গে সমন্বিতভাবে পরিচালিত হবে।
এডিবি প্রেসিডেন্ট মাসাতো কান্দা বলেছেন, বাংলাদেশ এখন অর্থনৈতিকভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে এবং এই সময়ে এডিবি দেশটির পাশে থাকতে চায়। তিনি ইতোমধ্যে ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে জ্বালানি তেল, এলএনজি, সার ও শিপিং ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এডিবি সম্প্রতি আরও ২৫০ মিলিয়ন ডলারের বাজেট সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকারকে শক্তিশালী করতে তারা বার্ষিক সার্বভৌম ঋণের পরিমাণ ২০ শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। ফলে বার্ষিক ঋণের পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। এই অর্থ বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য, সুশাসন এবং এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রক্রিয়াকে সহায়তা করবে।

