দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরে নজিরবিহীন রাজস্ব ঘাটতির মুখে পড়েছে।
প্রথমবারের মতো শুল্ক-কর আদায়ের ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থনীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপ, ব্যবসা-বাণিজ্যের ধীরগতি এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রভাব মিলিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনবিআরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে এটিই সর্বোচ্চ রাজস্ব ঘাটতি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। তবে এ সময়ে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত আদায়ের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী, পুরো অর্থবছরে এনবিআরকে মোট ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে। সেই লক্ষ্য পূরণ করতে মে ও জুন—এই দুই মাসে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা আদায় প্রয়োজন। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করতে হবে, যা বাস্তবতার বিচারে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজস্ব আদায়ের তিন প্রধান খাত—আয়কর, ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক—কোনোটিতেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। এ খাতে ঘাটতির পরিমাণ ৪৪ হাজার কোটি টাকা।
ভ্যাট খাতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। আর আমদানি শুল্ক আদায়ে ঘাটতি হয়েছে ২৫ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।
এনবিআরের কর্মকর্তারা বলছেন, নির্বাচন, সরকার পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে শুল্ক-কর আদায়ে।
অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে সরকার ইতিমধ্যে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা ৭ শতাংশ সুদে ঋণ পাবেন। বাকি ৬ শতাংশ সুদ ভর্তুকি হিসেবে দেবে সরকার।
সরকারি ব্যয়ের বড় অংশই আসে এনবিআরের রাজস্ব থেকে। প্রতিবছর জাতীয় বাজেটের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ জোগান দেয় এই সংস্থা। কিন্তু রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি তৈরি হলে সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ এবং অন্যান্য পরিচালন ব্যয় কমানোর সুযোগ খুব সীমিত। ফলে অর্থসংকট দেখা দিলে উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় কমানোই সরকারের প্রধান বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়।
বর্তমানে সরকার প্রায় দুই লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তবে রাজস্ব ঘাটতির কারণে এসব প্রকল্পের গতি কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
বিশ্লেষকেরা আরও বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত নিম্নমুখী। বর্তমানে তা ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে নেমে এসেছে, যা উদ্বেগজনক।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে রাজস্ব প্রশাসনে বড় ধরনের সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন। তাঁদের মতে, পুরোনো কাঠামো দিয়ে ক্রমবর্ধমান রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব নয়।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার রাজস্ব খাত সংস্কারে একটি অধ্যাদেশ জারি করলেও সেটি পরে কার্যকারিতা হারায়। এখন নতুন সরকার আবারও সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্বে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কর ফাঁকি রোধ, করজালের বাইরে থাকা করদাতাদের অন্তর্ভুক্ত করা, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি কঠিন হবে।

