আগামী অর্থবছরের শেষে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৫১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্য অর্জিত হলে তা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রিজার্ভ হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এ লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না।
এর আগে ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর দেশে বৈদেশিক মুদ্রার মোট রিজার্ভ ৪৮ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল, যা এখনো সর্বোচ্চ রেকর্ড হিসেবে রয়েছে। তখন প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল এবং আমদানি ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম ছিল। সেই পরিস্থিতি দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
বর্তমানে সরকার যে রিজার্ভের হিসাব তুলে ধরছে, তা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নির্ধারিত পদ্ধতির বাইরে কিছু অতিরিক্ত উপাদানও এ হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে সরকারি হিসাবে রিজার্ভের পরিমাণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হিসাবের তুলনায় বেশি দেখা যায়।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মে মাসের শেষভাগে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৪ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে এর পরিমাণ প্রায় ২৯ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুই ধরনের হিসাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, রিজার্ভ বৃদ্ধির জন্য প্রবাসী আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়তে হবে, একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত বাজেট সহায়তাও নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক ঋণ ও সহায়তার প্রবাহ শক্তিশালী না হলে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে। সরকার কি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে, নাকি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকে গুরুত্ব দেবে? কারণ বিনিয়োগ বাড়লে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে বেশি কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি করতে হবে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হবে।
অন্যদিকে, অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি অপরিহার্য। শুধু রিজার্ভ বাড়লেই অর্থনীতির সব সমস্যার সমাধান হয় না। যদি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হয় এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না বাড়ে, তাহলে রিজার্ভের উচ্চ পরিমাণ সাধারণ মানুষের জীবনমানে প্রত্যাশিত প্রভাব ফেলতে পারবে না।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে আমদানি প্রায় ৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও রপ্তানি আয় কিছুটা কমেছে। বিপরীতে প্রবাসী আয় প্রায় ১৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সরকারের আশা, আগামী অর্থবছরেও প্রবাসী আয়ের এই ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকবে।
আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার আমদানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধির লক্ষ্য ১৫ শতাংশ। এসব লক্ষ্য অর্জিত হলে রিজার্ভ বৃদ্ধির পথ আরও সুগম হতে পারে।
এদিকে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও রিজার্ভ বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। চলতি অর্থবছরে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৯০ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এ প্রবাহ কিছুটা কমে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে শ্রমবাজার এবং প্রবাসী আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকরা আরও সতর্ক করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশ যেহেতু জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ, তাই আন্তর্জাতিক বাজারের যেকোনো বড় পরিবর্তন সরাসরি দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে।
রিজার্ভ বৃদ্ধির পেছনে আরেকটি বড় ভূমিকা রাখতে পারে আন্তর্জাতিক ঋণ সহায়তা। সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা ইতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে। নতুন কর্মসূচির আওতায় আগামী অর্থবছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা পাওয়ার সম্ভাবনার কথা আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক এবং অন্যান্য উন্নয়ন অংশীদারদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত সহায়তা আসতে পারে।
তবে এই সহায়তা স্বল্পমেয়াদে রিজার্ভ বাড়ালেও দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি ঋণের বোঝা বৃদ্ধি করবে। ফলে সরকারকে একদিকে রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং অন্যদিকে ঋণ ব্যবস্থাপনাকে টেকসই রাখার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, ৫১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ অর্জনের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে উচ্চাভিলাষী। এটি বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রবাসী আয়, স্থিতিশীল রপ্তানি, আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং সঠিক অর্থনৈতিক নীতি। তবে একই সঙ্গে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ শক্তিশালী অর্থনীতির প্রকৃত ভিত্তি শুধু রিজার্ভ নয়, বরং উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ধারাবাহিক উন্নয়ন।

