ঈদুল আজহাকে ঘিরে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে কাঁচা চামড়ার আগমন এখন পূর্ণ গতিতে চলছে। ঈদের পরবর্তী ব্যস্ত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ট্রাকগুলোতে ভরে শিল্পনগরীতে পৌঁছে যাচ্ছে বিপুল পরিমাণ চামড়া। তিন দিনের হিসাবেই সেখানে প্রবেশ করেছে পাঁচ লাখেরও বেশি কাঁচা চামড়া, যা চলতি মৌসুমে সরবরাহ ও সংগ্রহ ব্যবস্থার বড় চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
শিল্পনগরী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন দিনে মোট পাঁচ লাখ ২৭ হাজারের বেশি চামড়া সেখানে প্রবেশ করেছে। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ১ হাজার ৭১২টি ট্রাকে এসব চামড়া আনা হয়। এর মধ্যে গরু ও মহিষের চামড়া সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি, আর ছাগল ও ভেড়ার চামড়াও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে রয়েছে।
সরেজমিন পরিস্থিতিতে দেখা যায়, পুরো শিল্পনগরীজুড়ে যেন এক ধরনের অবিরাম কর্মযজ্ঞ চলছে। কোথাও ট্রাক থেকে চামড়া নামানো হচ্ছে, কোথাও লবণ মিশিয়ে সংরক্ষণের কাজ চলছে, আবার কোথাও প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য শ্রমিকদের ব্যস্ততা চোখে পড়ছে। ঈদের মৌসুম হওয়ায় সাধারণ সময়ের তুলনায় চাপ কয়েকগুণ বেড়েছে, ফলে প্রতিটি ট্যানারিতেই কাজ চলছে প্রায় বিরামহীনভাবে।
শিল্পনগরীর প্রবেশপথ থেকে শুরু করে ভেতরের বিভিন্ন অংশ পর্যন্ত চামড়া পরিবহন কার্যক্রমে এক ধরনের ধারাবাহিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, এই সময়টায় দ্রুত চামড়া গ্রহণ ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সামান্য দেরি বা অব্যবস্থাপনা পুরো কাঁচামালের মানে প্রভাব ফেলতে পারে, যা শিল্পের ভবিষ্যৎ বাজারমূল্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
বিসিক কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো মেহরাজুল মাইয়ান শনিবার সন্ধ্যায় জানান, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ চামড়া শিল্পনগরীতে প্রবেশ করেছে এবং তা দ্রুত প্রক্রিয়াজাত করার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর মতে, ঈদের সময় অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে, যাতে সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো বড় ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে।
শিল্পনগরী সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঈদের প্রথম দিন থেকেই চামড়া প্রবেশ শুরু হয় এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর পরিমাণ বাড়তে থাকে। প্রথম ট্রাকটি আসে ঈদের প্রথম দিন দুপুরের কিছু পরে, এরপর ধীরে ধীরে এই প্রবাহ এক বড় স্রোতে পরিণত হয়।
ট্যানারি মালিক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সময়টি তাদের জন্য বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম সময়। কারণ এই কয়েক দিনের চামড়াই পুরো মৌসুমের কাঁচামালের বড় অংশ জোগান দেয়। ফলে প্রতিটি ধাপে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়, যাতে সংগ্রহ থেকে শুরু করে সংরক্ষণ পর্যন্ত কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়।
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুধু চামড়া গ্রহণই নয়, পরিবহন ও ব্যবস্থাপনাও সমানভাবে নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। জেলা প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে পুরো প্রক্রিয়া তদারকি করা হচ্ছে, যাতে ভিড় বা জটিলতা তৈরি না হয়।
শিল্পনগরীর পরিবেশে এই সময়ে এক ধরনের অর্থনৈতিক গতি তৈরি হয়, যা শুধু ট্যানারি শিল্প নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত পরিবহন, শ্রম ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ঈদের পরবর্তী কয়েক দিনে এই প্রবাহ দেশের চামড়া শিল্পের সামগ্রিক চিত্র অনেকটাই নির্ধারণ করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন বিপুল পরিমাণ চামড়া একসঙ্গে প্রবেশ করায় দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ সামান্য অবহেলাও গুণগত মানে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, যা রপ্তানি বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে ঈদকেন্দ্রিক এই তিন দিনের কার্যক্রম শুধু একটি মৌসুমি চিত্র নয়, বরং দেশের চামড়া অর্থনীতির বাস্তব সক্ষমতা ও চ্যালেঞ্জ দুটোকেই একসঙ্গে তুলে ধরছে।

