বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও নীতিগত স্থিতিশীলতা এখনো তৈরি হয়নি বলে মনে করেন দেশের শীর্ষ শিল্পোদ্যোক্তাদের একজন রিয়াদ মাহমুদ। তাঁর মতে, জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশের প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু বৈশ্বিক অস্থিরতা, জ্বালানি সংকট এবং অর্থনৈতিক চাপ সেই প্রত্যাশা পূরণ হতে দেয়নি।
সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং আসন্ন বাজেট নিয়ে খোলামেলা মতামত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। অনেকেই ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি সেই পরিকল্পনাকে এগিয়ে নিতে পারেনি।
রিয়াদ মাহমুদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির জন্য শুধু সরকারকে দায়ী করাও ঠিক হবে না। কারণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন, বিদ্যুতের চাপ এবং ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে শিল্পকারখানার পরিচালন ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি পণ্য পরিবহনের খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য ব্যবসায়ীরা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা খোঁজেন। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিবেশ অনুপস্থিত। ফলে অধিকাংশ উদ্যোক্তা অপেক্ষা করছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার জন্য।
তাঁর মতে, বিনিয়োগ কমে যাওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ দেশের ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা। অনেক ব্যাংক আগের মতো অর্থায়ন সক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে না। এতে নতুন প্রকল্পে অর্থ জোগান পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজনীয় চলতি মূলধন নিশ্চিত না হলে উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হন না।
রিয়াদ মাহমুদ বলেন, বিনিয়োগ শুধু উদ্যোক্তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে না; এর জন্য আর্থিক খাতের শক্ত অবস্থানও জরুরি। যদি ব্যাংকগুলো কার্যকরভাবে অর্থায়ন করতে না পারে, তাহলে উৎপাদনশীল খাতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া কঠিন হয়ে যায়।
নিজের প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, বর্তমান কঠিন পরিস্থিতিতে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি টিকে থাকতে পারে, সেটিই বড় অর্জন। তাঁর ভাষায়, এমন পরিবেশে টিকে থাকা মানেই ভালো অবস্থানে থাকা।
দীর্ঘদিন ধরে দেশের বাজারে প্রতিষ্ঠিত তাঁর প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের মূল রহস্য হিসেবে তিনি একটি বিষয়কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন—গুণগত মান। শুরু থেকেই পণ্যের মান বজায় রাখার নীতিতে অটল থাকার কারণেই প্রতিষ্ঠানটি ভোক্তাদের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে বলে তিনি মনে করেন।
জ্বালানি ও গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি বর্তমানে শিল্পখাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। অনেক কারখানা নিয়মিত উৎপাদন ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সুবিধা পাচ্ছে না, তারা আরও বেশি সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করছে এবং সামগ্রিক শিল্প খাতকে চাপে ফেলছে।
এদিকে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টিও ব্যবসার জন্য বড় উদ্বেগের কারণ বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, মানুষের হাতে ব্যয় করার মতো অর্থ কমে গেলে বাজারে চাহিদা হ্রাস পায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে উৎপাদন ও বিক্রিতে।
আসন্ন জাতীয় বাজেট নিয়ে প্রত্যাশা ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন, শিল্প খাত ইতোমধ্যেই নানা চাপের মধ্যে রয়েছে। তাই কাঁচামালের ওপর নতুন করে শুল্ক বা করের বোঝা বাড়ানো হলে উৎপাদন খরচ আরও বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে পণ্যের দাম বাড়বে, কিন্তু ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা সেই হারে বাড়বে না। এতে বিক্রি কমবে এবং অনেক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা অলস হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ ঋণ তহবিলকে তিনি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। তবে তাঁর মতে, এটি কোনো দান নয়; বরং উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখার একটি সহায়ক ব্যবস্থা। যেসব প্রতিষ্ঠান চলতি মূলধনের সংকটে নিজেদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না, তাদের এই সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা না গেলে অনেক পরিচালনাধীন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধীরে ধীরে কার্যক্রম সংকুচিত করতে বাধ্য হবে। তাই অর্থনীতি সচল রাখতে এবং কর্মসংস্থান ধরে রাখতে বাস্তবমুখী নীতি গ্রহণের বিকল্প নেই।
সামগ্রিকভাবে রিয়াদ মাহমুদের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা এখনো আশাবাদী, কিন্তু তারা নতুন ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনীতি আবারও গতি ফিরে পেতে পারে বলে মনে করছেন তিনি।

