দেশের স্টিল শিল্প যখন চাহিদা সংকট ও ব্যবসায়িক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন মাইল্ড স্টিল (এমএস) ও এ ধরনের পণ্যের উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কর বা স্পেসিফিক ট্যাক্স বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই কর প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে।
আগামী অর্থবছরের বাজেটের সঙ্গে উপস্থাপিত অর্থবিলে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। উল্লেখ্য, গত বাজেটেও একই ধরনের পণ্যের ওপর সুনির্দিষ্ট কর বৃদ্ধি করা হয়েছিল। তবে এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করের বোঝা শিল্পের জন্য উদ্বেগজনক হতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ধীরগতির কারণে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং নির্মাণকাজে গতি কমেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রড ও অন্যান্য স্টিল পণ্যের বাজারে। ফলে চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে রি-রোলেবল স্ক্র্যাপ থেকে উৎপাদিত এমএস পণ্যের ওপর প্রতি টনে ১ হাজার ৭০০ টাকা সুনির্দিষ্ট কর রয়েছে। নতুন প্রস্তাবে তা ১৭০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। একইভাবে মেল্টেবল স্ক্র্যাপ থেকে উৎপাদিত বিলেট ও ইনগটের ওপর বর্তমান ১ হাজার ৫০০ টাকার করের সঙ্গে আরও ১৫০ টাকা যুক্ত হতে পারে। বিলেট বা ইনগট থেকে তৈরি এমএস পণ্যের ক্ষেত্রে কর প্রতি টনে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর চিন্তা রয়েছে। অন্যদিকে মেল্টেবল স্ক্র্যাপ থেকে উৎপাদিত ইনগট বা বিলেট এবং সেগুলো থেকে তৈরি এমএস পণ্যের ওপর কর প্রতি টনে ২২০ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদিত এমএস রডের ওপর বর্তমান সুনির্দিষ্ট কর আরও বেশি হওয়া উচিত। বিষয়টি পর্যালোচনা করে যৌক্তিক মাত্রায় ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাব দেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে শিল্প উদ্যোক্তাদের অবস্থান ভিন্ন। মেট্রোসেম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শহীদুল্লাহর মতে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় ভ্যাট বাড়ানো সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত হবে না।
তিনি বলেন, দেশে অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম কমে যাওয়ায় স্টিল ও সংশ্লিষ্ট কাঁচামালের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে। এমন অবস্থায় অতিরিক্ত ভ্যাট আরোপ করা হলে বাজারে চাহিদা আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রতি টন রড ৮০ হাজার থেকে ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি হলেও ইরান যুদ্ধ শুরুর পর বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। মো. শহীদুল্লাহ জানান, বর্তমানে প্রতি টন রডের দাম ৮৫ হাজার থেকে ৯২ হাজার টাকার মধ্যে রয়েছে।
অন্যদিকে এনবিআরের কর্মকর্তারা মনে করেন, ভ্যাট বৃদ্ধির ফলে প্রতি টনে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত মূল্য বাড়লেও তা বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে না।
বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএসএমএ)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ২০০টি স্টিল মিল কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৪০। খাতটির মোট স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন টন।
স্বাভাবিক সময়ে দেশে এমএস রড, শিট, বিম, অ্যাঙ্গেল ও প্লেটসহ বিভিন্ন স্টিল পণ্যের বার্ষিক চাহিদা ৬ মিলিয়ন টনের বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশজুড়ে রয়েছে এমএস রড বা রিবার, যা নির্মাণ খাতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
তবে রিয়েল এস্টেট খাতের মন্দা, উচ্চ সুদহার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বর্তমানে রডের চাহিদা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

