আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে সম্পদ কর পুনঃপ্রবর্তন, কর অব্যাহতি ও রেয়াত কমানো, রফতানি প্রণোদনায় উৎসে কর বাড়ানো এবং উৎসে কর ব্যবস্থার পরিধি সম্প্রসারণের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ও অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্তগুলোকে ঘিরে বড় ও নিয়মিত করদাতা উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, রাজস্ব ঘাটতি পূরণে নতুন করদাতা বাড়ানোর বদলে বিদ্যমান করদাতাদের ওপরই বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, আগামী বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। আর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা চলছে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই অবস্থায় কর অব্যাহতি পুনর্মূল্যায়ন, করজাল সম্প্রসারণ এবং উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে কাজ করছে এনবিআর।
চলতি অর্থবছরের দুর্বল রাজস্ব পরিস্থিতিও এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই–এপ্রিল) রাজস্ব আদায় হয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। ফলে টানা দশম বছরের মতো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে তারা একমত। তবে করজাল সম্প্রসারণে দৃশ্যমান অগ্রগতি ছাড়া একই করদাতাদের ওপর বারবার নতুন চাপ দেওয়া হলে বিনিয়োগ, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বৃহৎ শিল্প ও করপোরেট খাতের সংগঠনগুলোর দাবি, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে হলে নতুন করদাতা শনাক্ত করাই মূল পথ হওয়া উচিত। সীমিত সংখ্যক নিয়মিত করদাতার ওপর চাপ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আহরণও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, নিয়মিত করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ দিলে তারা ভবিষ্যতে কর দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়তে পারেন। তিনি আরও বলেন, দেশে করদাতার ভিত্তি বাড়ানো জরুরি, কারণ সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই করের আওতার বাইরে রয়েছেন। একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীরাও। তাদের মতে, করজাল সম্প্রসারণ না হওয়ায় নিয়মিত করদাতা ও কমপ্লায়েন্ট ব্যক্তি–প্রতিষ্ঠানের ওপর বারবার চাপ তৈরি হচ্ছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশে বহু পেশাজীবী ও ব্যবসায়ী আছেন যারা উল্লেখযোগ্য আয় করলেও কর দেন না। ফলে নিয়মিত করদাতাদের ওপরই অতিরিক্ত চাপ পড়ছে। এতে কর মেনে চলার মানসিকতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, রাজস্ব বাড়াতে হলে নতুন করদাতা শনাক্ত ও করজাল সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে। নীতিনির্ধারণে ভারসাম্য না থাকলে ব্যাংকে টাকা রাখার প্রবণতাও কমে যেতে পারে।
দেশের কর-জিডিপি অনুপাত নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের একটি অংশ। তাদের মতে, জিডিপির প্রকৃত আকার নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। এই হিসাব পুনর্মূল্যায়ন হলে কর-জিডিপি অনুপাত সম্পর্কিত ধারণাও পরিবর্তিত হতে পারে। এ বিষয়ে কামরান তানভিরুর রহমান বলেন, জিডিপির হিসাব সঠিক না হলে কর-জিডিপি অনুপাতও পরিবর্তিত হবে। জিডিপি কম হলে অনুপাত স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যাবে।
সম্পদ কর বা ওয়েলথ ট্যাক্স নিয়েও ব্যবসায়ী মহলে আলোচনা চলছে। সূত্র অনুযায়ী, বিদ্যমান সারচার্জ ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সম্পদ কর চালুর বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনায় রয়েছে। উচ্চ সম্পদধারীদের ওপর সর্বোচ্চ ১ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাবও আলোচনায় আছে।
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের ওপর কর আরোপের সম্ভাবনাও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ বিষয়ে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অনেক ক্ষেত্রে সম্পদ থাকলেও নিয়মিত আয় থাকে না। ফলে কর পরিশোধের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে কর অব্যাহতি, বিশেষ সুবিধা, কর রেয়াত ও ট্যাক্স হলিডে পুনর্বিবেচনার উদ্যোগও চলছে। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, করহার না বাড়লেও করছাড় কমে গেলে কার্যকর করভার বেড়ে যাবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই কম। তাই অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার ব্যয় মেটাতে রাজস্ব বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। তবে তারা করজাল সম্প্রসারণ ও কর ব্যবস্থার সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী বলেন, রাজস্ব না বাড়ালে উন্নয়ন কার্যক্রম চালানো কঠিন। বাজেটের আকার বড় করতে হলে রাজস্ব বাড়ানো অপরিহার্য।
তিনি আরও বলেন, শুধু করহার বাড়ানো নয়, বরং পুরো কর প্রশাসন ও ব্যবস্থায় সংস্কার দরকার। দীর্ঘদিন ধরে দেওয়া কর সুবিধা অনেক ক্ষেত্রে স্থায়ী রূপ নিয়েছে, যা পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। তার মতে, উদ্যোক্তাদের ধীরে ধীরে কর নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতার দিকে মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
রফতানি খাতেও নতুন কর চাপ নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আলোচনা অনুযায়ী, নগদ সহায়তার ওপর উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করার প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। এতে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে রফতানিমুখী উদ্যোক্তারা বলছেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ও উৎপাদন ব্যয়ের মধ্যে নতুন চাপ শিল্পের সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বড় বাজেট ও উচ্চ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। কারণ করের আওতা না বাড়লে চাপ বর্তমান করদাতাদের ওপরই পড়বে। তিনি আরও বলেন, অনেক ক্ষেত্রে বিক্রির ওপর কর দিতে হচ্ছে, যা লোকসানেও কর দিতে বাধ্য করছে। এটি করনীতির মূল ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নিত্যপণ্যের সরবরাহ পর্যায়েও উৎসে কর বাড়ানোর চিন্তা রয়েছে। চাল, ডাল, গম, ভোজ্যতেল, আলু, পেঁয়াজসহ ২৮টি পণ্যে উৎসে কর ০.৫০ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব আলোচনায় আছে। চিনি আমদানিতেও শুল্ক বাড়ানোর বিষয় বিবেচনায় রয়েছে। রাষ্ট্রীয় চিনিকলগুলোর লোকসান কমানো ও রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এই প্রস্তাব এসেছে বলে জানা গেছে।
বর্তমানে দেশে চিনির চাহিদা প্রায় ১৮ লাখ টন হলেও সরকারি উৎপাদন সক্ষমতা খুবই সীমিত। ফলে বাজার মূল্যের সঙ্গে উৎপাদন ব্যয়ের বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে। চিনির শুল্ক বাড়ালে বছরে ২ থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে আমদানিকারকরা আশঙ্কা করছেন, এতে ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়বে।
মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, চিনির ওপর ইতোমধ্যে শুল্ক বেশি। নতুন করে বাড়ালে ভোক্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আরও বলেন, শিল্পনীতি এমন হওয়া উচিত যেখানে সক্ষমতা তৈরি ও প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত হয়।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ব্যবসার পরিবেশ সহজ ও স্বচ্ছ না হলে টেকসই প্রবৃদ্ধি সম্ভব নয়। অন্যদিকে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান জানিয়েছেন, আসন্ন বাজেট ব্যবসাবান্ধব ও সহনীয় করার চেষ্টা চলছে। বাজেটে রাজস্ব বাড়াতে নতুন কর, রেয়াত কমানো ও উৎসে কর সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে উদ্বেগ বাড়ছে।

