বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি আগামী এক বছরে দুর্বল হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত প্রধান অর্থনীতিবিদদের ওপর করা এক জরিপে অংশ নেওয়া ৯০ শতাংশ জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের মধ্যে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। জেনেভা থেকে প্রকাশিত ‘চিফ ইকোনমিস্টস আউটলুক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৬ সালের শুরুতে যে সতর্ক আশাবাদ দেখা গিয়েছিল, তা এখন অনেকটাই উল্টে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থাকে বৈশ্বিক অর্থনীতির বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জরিপে অংশ নেওয়া ৯৪ শতাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, আগামী বছরে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাবে। তাদের মতে, বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিতে সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার প্রভাব গত বছরের শুল্ক অস্থিরতার চেয়েও বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। যদি এই পরিস্থিতি বছরের জুন পর্যন্ত চলতে থাকে, তবে এর প্রভাব কোভিড-১৯ মহামারির সময়কার বৈশ্বিক সংকটের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এতে জ্বালানি, খাদ্য ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ আরও বাড়বে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাদিয়া জাহিদি বলেন, মাত্র কয়েক মাস আগেও প্রধান অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সতর্ক আশাবাদ ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সেই পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে। তিনি বলেন, এই বিঘ্ন যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, এর ক্ষতির বোঝা তত বেশি পড়বে তাদের ওপর, যারা তা বহন করার সামর্থ্য সবচেয়ে কম রাখে। প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে সরকারি ও বেসরকারি খাতের শীর্ষ অর্থনীতিবিদদের মতামত ও জরিপের ভিত্তিতে। জরিপটি পরিচালিত হয় গত ৬ থেকে ১৭ এপ্রিলের মধ্যে।
অঞ্চলভিত্তিক ভিন্ন চিত্র:
জরিপ অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে। কয়েক মাস আগেও অঞ্চলটিকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হলেও এখন ৮৮ শতাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, এখানে প্রবৃদ্ধি দুর্বল বা খুবই দুর্বল হবে। অন্যদিকে সাব-সাহারান আফ্রিকায় মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সব অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। ইউরোপে প্রবৃদ্ধি কমার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি বাড়ায় স্ট্যাগফ্লেশনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
তবে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিনিয়োগ এই দুই দেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জরিপে বড় ধরনের বৈশ্বিক মন্দার সম্ভাবনা এখনো কম বলে মনে করা হচ্ছে। অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ আগামী ১২ মাসে বিশ্ব অর্থনীতি মন্দায় পড়বে বলে আশঙ্কা করেন না। তবে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা দ্রুত ফিরে আসবে, এমন সম্ভাবনাও কম। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি কতদিন স্থায়ী হয়, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। স্বল্পমেয়াদি অচলাবস্থা কাটলে পুনরুদ্ধারের সুযোগ থাকলেও দীর্ঘমেয়াদে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াবে।
আর্থিক বাজারেও অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৭৯ শতাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, বেসরকারি ঋণবাজারে অস্থিরতা বাড়বে। ৭৪ শতাংশ সরকারি ঋণবাজার এবং ৬৮ শতাংশ শেয়ারবাজারে অস্থিরতা বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ৯২ শতাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, আগামী বছরে এর ব্যবহার আরও বাড়বে। তবে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এর প্রভাব নিয়ে আগের তুলনায় কিছুটা সতর্কতা দেখা গেছে। জানুয়ারির পূর্বাভাসের তুলনায় এখন মনে করা হচ্ছে, বিভিন্ন খাতে এআইয়ের ইতিবাচক প্রভাব পেতে আরও সময় লাগবে।
শিক্ষা ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত ছাড়া প্রায় সব খাতেই প্রত্যাশা কমেছে। বিশেষ করে প্রকৌশল, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও পরিচর্যা খাতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সুফল তুলনামূলকভাবে দেরিতে আসবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

