আগামী অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষের খরচের চাপ কমছে না। বরং শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বাজেট ঘোষণার পরই বিভিন্ন শিক্ষা সামগ্রীর দাম আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
অন্যদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেতন বৃদ্ধি এবং নানা অজুহাতে অতিরিক্ত ফি আদায় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় অভিভাবকদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়ছে। তবে সরকারের পরিকল্পনায় কিছু ইতিবাচক উদ্যোগও রয়েছে। শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রায় সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানোর নির্দেশনাও থাকছে।
শিক্ষা উপকরণের মধ্যে স্কুলব্যাগ, জুতা, স্যান্ডেল, খাতা, কলম, পেন্সিল, টিফিন বক্সসহ নানান সামগ্রী রয়েছে। রাজধানীর বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত বছর যে স্কুলব্যাগ ২০০ টাকায় বিক্রি হতো, বর্তমানে তা ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য উপকরণের দামও একইভাবে বেড়েছে। পাশাপাশি খাদ্যদ্রব্যের দাম বৃদ্ধির কারণে শিক্ষার্থীদের টিফিন খরচও বেড়ে গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সূত্রে জানা যায়, আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে মূল্য সংযোজন কর ও অন্যান্য করের হার ও পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাব এক হাজারের বেশি পণ্যের ওপর পড়বে, যার মধ্যে প্রায় সব ধরনের শিক্ষা উপকরণও রয়েছে। ফলে এসব পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ জানান, বাজেট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই যেসব খাতে কর বা মূল্য সংযোজন কর বাড়ানো হয়, সেগুলোর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বাজারে পড়ে এবং দাম বেড়ে যায়। তবে যেসব ক্ষেত্রে কর কমানো হয়, তা নতুন অর্থবছর থেকে কার্যকর হয়।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, কয়েক বছর ধরে শিক্ষা উপকরণের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। একই সঙ্গে কিন্ডারগার্টেন থেকে শুরু করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষার ব্যয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তার মতে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কোন প্রতিষ্ঠান কতটা ফি বাড়াতে পারবে, তা নিয়ে কঠোর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। বাজেট যেহেতু রাষ্ট্রের আয়–ব্যয়ের মূল কাঠামো, তাই শিক্ষা ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি। না হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।
একই মত দেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ এর সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, শিক্ষা খাতকে দুই ভাগে দেখা উচিত—একদিকে সাধারণ মানুষের শিক্ষা ব্যয় কমানো, অন্যদিকে শিক্ষার মানোন্নয়ন। তার মতে, শিক্ষা উপকরণের ওপর কর শূন্য করা হলে দাম কমতে পারে, কিন্তু কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে বিপরীত প্রভাব পড়বে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আগামী অর্থবছরে শিক্ষা খাতে চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫২ দশমিক ৯২ শতাংশ বেশি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে। শিক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে উন্নয়ন প্রকল্পে ২০ হাজার ৮৩৫ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে।
শিক্ষক সংকট কমাতে দেশজুড়ে নতুন নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক পদে ৭৭ হাজার ৭৯৯টি শূন্যপদের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পাশাপাশি ৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ ‘লার্নিং এক্সিলারেশন ইন সেকেন্ডারি এডুকেশন’ প্রকল্পের আওতায় ১০ হাজার ৩৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ২০ হাজার ৬৮০টি মাল্টিমিডিয়া শ্রেণিকক্ষ স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে।
এছাড়া দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনামূল্যে ইন্টারনেট সেবা চালুর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের সুযোগ–সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্তও বাজেটে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। শিক্ষাবৃত্তির অর্থ দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য রাষ্ট্রীয় সহায়তায় সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জামানতবিহীন ব্যাংক গ্যারান্টি দেওয়ার বিধান চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এর উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসান বলেন, শিক্ষা খাতে মোট দেশজ উৎপাদনের ৫ শতাংশ ব্যয় করার উদ্যোগ ইতিবাচক। তার মতে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত, যেখানে বিনিয়োগ বাড়লে সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
অন্যদিকে নোয়াখালীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো অবকাঠামো, শিক্ষক সংকট এবং প্রযুক্তিগত ঘাটতির মধ্যে রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে বাড়তি বরাদ্দ জরুরি। তিনি আরও বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. ওমর ফারুক বলেন, শিক্ষা খাতের বাজেট এমন হওয়া উচিত, যা শুধু ফলাফলের হার বাড়াবে না, বরং দক্ষ ও আধুনিক মানবসম্পদ গড়ে তুলবে। তার মতে, গবেষণা, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন।

