দেশে স্বর্ণ ব্যবসার পরিধি বড় হলেও এই খাত থেকে প্রত্যাশিত আয়কর আদায়ে দীর্ঘদিন ধরেই চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, টার্নওভার করের হার তুলনামূলক বেশি হওয়ার অজুহাতে অনেক ব্যবসায়ী প্রকৃত আয় ও বিক্রির তথ্য কর নথিতে তুলে ধরেন না। কেউ কেউ আবার করের দায় এড়াতে নিজেদের প্রকৃত পেশাও গোপন রাখেন।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ৫০ হাজারেরও বেশি স্বর্ণ ব্যবসায়ী রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার ব্যবসায়ী বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সদস্য। কিন্তু এত বড় খাত হওয়া সত্ত্বেও কর আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই।
রাজস্ব কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে বৈধ উপায়ে স্বর্ণ আমদানি খুবই সীমিত। মূলত ব্যাগেজ সুবিধা এবং অবৈধ চোরাচালান পথেই অধিকাংশ স্বর্ণ দেশে প্রবেশ করে। ফলে ব্যবসার প্রকৃত আকার নির্ধারণ এবং কর আদায় কার্যক্রমও জটিল হয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে জুয়েলারি খাতের টার্নওভার কর কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে সরকার। বর্তমানে এক শতাংশ হারে যে কর আরোপিত রয়েছে, তা কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার আলোচনা চলছে।
বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, করের হার কমানো হলে রাতারাতি রাজস্বের বড় উল্লম্ফন না ঘটলেও অধিকসংখ্যক ব্যবসায়ী কর ব্যবস্থার আওতায় আসতে উৎসাহিত হবেন। এতে করদাতার সংখ্যা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আদায়ও উন্নত হতে পারে।
এদিকে সম্প্রতি এনবিআরের সঙ্গে বৈঠক করেছে বাজুসের প্রতিনিধিদল। এর আগে সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে এনবিআরে একটি চিঠিও জমা দেয়। সেখানে তাদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল টার্নওভার করের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনা।
বাজুসের বক্তব্য, বর্তমানে মোট প্রাপ্তির ওপর এক শতাংশ টার্নওভার কর আরোপ করা হচ্ছে, যা অনেক ব্যবসায়ীর কাছে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের দাবি, করের হার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনা হলে ব্যবসায়ীরা প্রকৃত বিক্রির তথ্য গোপন না করে স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করতে আগ্রহী হবেন।
সংগঠনটির মতে, বিদ্যমান কর কাঠামোর কারণে অনেক ব্যবসায়ী প্রকৃত বিক্রয় তথ্য দেখাতে নিরুৎসাহিত হন। এর ফলে সরকারও সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। করহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা গেলে ব্যবসায়ীদের কর পরিপালন বাড়বে এবং ভ্যাট আদায়ও সহজ হবে। বাজুসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই পরিবর্তন না এলে জুয়েলারি খাত থেকে প্রত্যাশিত প্রায় ৪০০ কোটি টাকার ভ্যাট সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
চিঠিতে করহারের পক্ষে কয়েকটি উদাহরণও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, কোনো ব্যবসায়ীর বার্ষিক মোট বিক্রয় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা হলে এবং সব ব্যয় বাদ দিয়ে নিট মুনাফা ৫ হাজার টাকা দাঁড়ালে, ২৫ শতাংশ হারে আয়কর পরিশোধ করলে করের পরিমাণ হয় ১ হাজার ২৫০ টাকা। একই বিক্রয়ের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ টার্নওভার কর আরোপ করলেও করের পরিমাণ প্রায় একই থাকে। ফলে করহার কমানো হলেও সরকারের রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা নেই বলে দাবি সংগঠনটির।
একইসঙ্গে জুয়েলারি খাতে উৎসে আয়কর কর্তনের বিধান পুরোপুরি প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দিয়েছে বাজুস। তা সম্ভব না হলে উৎসে করের হার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশের বেশি না রাখার অনুরোধ জানিয়েছে তারা। পাশাপাশি উৎসে কাটা করকে টার্নওভার করের সঙ্গে সমন্বয়ের সুযোগ দেওয়ার দাবিও জানিয়েছে সংগঠনটি।
বাজুসের দেওয়া আরেকটি উদাহরণে বলা হয়েছে, কোনো ব্যবসায়ীর বার্ষিক বিক্রয় ১ কোটি টাকা হলে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হারে টার্নওভার কর দাঁড়াবে ৫০ হাজার টাকা। একই পরিমাণ অর্থ উৎসে আয়কর হিসেবে কাটা হলে উভয় করের মধ্যে সমন্বয় করার সুযোগ থাকলে ব্যবসায়ীদের ওপর দ্বৈত করের চাপ কমবে। এতে তারা প্রকৃত বিক্রয় তথ্য প্রকাশে আরও উৎসাহিত হবেন এবং সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।
এনবিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, করের হার কমানো হলে বাজুসের সদস্যরা বিক্রয় ও আয়ের প্রকৃত হিসাব কর নথিতে প্রদর্শনের আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের স্বর্ণ খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা ক্ষেত্র। এই খাতের বাস্তবতা এবং ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ও সরকার বিবেচনায় নিচ্ছে। একইসঙ্গে কর ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও অংশগ্রহণমূলক করার চেষ্টা চলছে।

