দেশের অর্থনীতিতে সংস্কারের আলোচনা এখন আর শুধু নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। ব্যাংক খাত থেকে রাজস্ব ব্যবস্থা, ভর্তুকি কাঠামো থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম—প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতেই পরিবর্তনের চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের সুপারিশ এবং দেশীয় অর্থনীতিবিদদের মতামতের ভিত্তিতে সরকারও ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে সামনে আসছে আরেকটি বাস্তবতা। বহু বছর ধরে জমে থাকা নীতিগত দুর্বলতা, আর্থিক অনিয়ম ও প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার যে মূল্য রয়েছে, তা এখন ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হচ্ছে। আর সেই ব্যয়ের বড় অংশ বহন করতে হতে পারে করদাতা, ভোক্তা, ব্যবসায়ী এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই বাস্তবতার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। যদিও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বর্তমান কর্মসূচি শেষ হচ্ছে, তবু নতুন সমঝোতা কাঠামোর আলোচনায় রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ভর্তুকি ব্যবস্থাকে আরও যৌক্তিক করার মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। একই সঙ্গে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সংস্কার-সংশ্লিষ্ট শর্তও বহাল রয়েছে। ফলে নতুন বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক অসংগতি দূর করার একটি রূপরেখা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সংস্কার দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনলেও স্বল্পমেয়াদে এর কিছু মূল্য পরিশোধ করতেই হয়। ব্যাংক খাত পুনর্গঠনে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হতে পারে। ভর্তুকি কমলে পণ্যের দাম ও সেবার খরচ বাড়ার প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের ওপর। করজাল সম্প্রসারণের ফলে নতুন করদাতা যুক্ত হবে এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের ভাষ্য, সংস্কারের লক্ষ্য অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো। তবে এই প্রক্রিয়ায় স্বল্পমেয়াদে কিছু চাপ তৈরি হবেই। তাঁর মতে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই চাপ সমাজের কোন অংশ বহন করবে এবং সরকার কীভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেবে।
বর্তমানে সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে ব্যাংক খাত। খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ও পুনঃতফসিল করা ঋণ যুক্ত করলে ঝুঁকিপূর্ণ ঋণের প্রকৃত পরিমাণ আরও বড় হয়ে দাঁড়ায়। আইএমএফ এ খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, খেলাপি ঋণ কমানো, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
গত ১৫ বছরে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা মূলধন সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনরুদ্ধারে আরও ২৫ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে, যার একটি অংশ সরকারি তহবিল থেকেই আসবে।
রাজস্ব খাতেও বাড়ছে সংস্কারের চাপ। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও প্রায় ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এ অবস্থায় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক করজাল সম্প্রসারণ, কর অব্যাহতি কমানো এবং কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর জোর দিচ্ছে। পাশাপাশি প্রতি বছর জিডিপির দশমিক ৬ শতাংশ সমপরিমাণ অতিরিক্ত রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যও রয়েছে। নতুন আইএমএফ কর্মসূচিতেও এমন শর্ত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সব পর্যায়ে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর কার্যকরের চাপও রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে আরও বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান করের আওতায় আসতে পারে এবং কর ও ভ্যাটের বাস্তব বোঝাও বাড়তে পারে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, ব্যবসায়ীরা সংস্কারের বিরোধী নন। তবে নীতির ধারাবাহিকতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভর্তুকি সংস্কারও সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও কৃষি খাতে বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। এখন উন্নয়ন সহযোগীরা এই ব্যয়কে আরও লক্ষ্যভিত্তিক করার পরামর্শ দিচ্ছে। এর অর্থ হলো, প্রকৃত ব্যয়ের একটি বড় অংশ ব্যবহারকারীদেরই বহন করতে হবে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করতে পারে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থাও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাত্র এক বছরেই এসব প্রতিষ্ঠানের পেছনে সরকারি কোষাগার থেকে প্রায় ৮৮ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এটি অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই চাপ কমাতে উন্নয়ন সহযোগীরা প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা বৃদ্ধি, পুনর্গঠন এবং কিছু ক্ষেত্রে বেসরকারি অংশীদারত্ব বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে আসছে।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী একাধিক অনুষ্ঠানে বলেছেন, স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, আসন্ন বাজেটে সংস্কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হবে।

