চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জুলাই-মার্চ) সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৮ হাজার ৪২৬ কোটি টাকায়। এই ব্যয়ের বড় অংশই গেছে রাষ্ট্র পরিচালনার দৈনন্দিন কাজে, যেখানে ব্যয়ের চাপ মূলত পরিচালন খাতকেন্দ্রিক।
অর্থ বিভাগের প্রান্তিক বাজেট বাস্তবায়ন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার ব্যয় লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে প্রথম নয় মাসে বাস্তবায়ন হয়েছে ৫২ শতাংশ। ফলে অর্থবছরের শেষ তিন মাসে বাকি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সরকারের সামনে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকার বড় ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট ব্যয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ বা ৩ লাখ ৪২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে পরিচালন খাতে। এর মধ্যে ৯২ শতাংশই চলতি ব্যয়, যার পরিমাণ ৩ লাখ ১৩ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এ সময়ে শুধু সুদ পরিশোধেই ব্যয় হয়েছে ৯৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা, যা পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ২৯ শতাংশ। অবকাঠামো নির্মাণসহ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ খাতের ব্যয়কে মূলধনী ব্যয় ধরা হয়। এ খাতে নয় মাসে ব্যয় হয়েছে ২৮ হাজার ৩২৩ কোটি টাকা।
রাজস্ব আহরণে ঘাটতির কারণে সরকারকে বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়েছে। নয় মাসে রাজস্ব ও অনুদান মিলিয়ে আয় হয়েছে ৩ লাখ ৩২ হাজার ৯৯৮ কোটি টাকা। আর অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা কম।
ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। তবে ব্যাংক-বহির্ভূত খাত থেকে ঋণ প্রবাহ ঋণাত্মক ২০ হাজার ২২৪ কোটি টাকা। বিদেশি উৎস থেকেও নিট ঋণ ছিল ঋণাত্মক ৯ হাজার ৯৬৫ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ২৫৩ কোটি টাকায়।
চলতি অর্থবছরের বাজেট ২০২৫ সালের জুনে ঘোষণা করা হয়। প্রথম আট মাস দায়িত্বে ছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার এবং পরবর্তী চার মাস দায়িত্ব নেয় বর্তমান বিএনপি সরকার। তবে নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ১১ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায়। এতে অতিরিক্ত ৪০ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার ব্যয় চাপ তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এ পরিস্থিতিতে সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকেও অতিরিক্ত সহায়তা চেয়েছে।
বাজেট বাস্তবায়নের ধীরগতিকে দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পুরো নয় মাসের মধ্যে বর্তমান সরকারের কার্যকর সময় খুব সীমিত ছিল। তবে এটি কেবল নির্দিষ্ট সময়ের সমস্যা নয়, বরং প্রশাসনিক কাঠামোর ধারাবাহিক চিত্র। তাঁর মতে, শুধু অর্থ ব্যয় নয়, সেই ব্যয় কতটা মানসম্মত ও সঠিক উদ্দেশ্যে হচ্ছে সেটিই বড় প্রশ্ন। শেষ সময়ে তড়িঘড়ি ব্যয় বাড়লে গুণগত মান কমে যায় এবং প্রকৃত লক্ষ্য অর্জন বাধাগ্রস্ত হয়।
সাবেক অর্থ সচিব ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, এ বছর পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ স্বাভাবিক প্রবণতার মতোই হয়েছে। তবে উন্নয়ন ব্যয় তুলনামূলকভাবে ধীর। রাজনৈতিক পরিবর্তন ও প্রশাসনিক রূপান্তরের কারণে বাজেট বাস্তবায়নে স্বাভাবিক গতি বজায় রাখা যায়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। নয় মাসে উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ৫৭ হাজার ৫৪ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২৩ শতাংশ। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ৫৫ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনেক প্রকল্পে সময় ও ব্যয় উভয়ই বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক বাস্তবায়নে প্রভাব পড়েছে। এসব সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের জন্য একটি পর্যালোচনা প্রতিবেদন তৈরির কাজ চলছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয়সীমা মানা এখন সরকারের অগ্রাধিকার। চলমান প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি কাঠামোগত সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যাবে এবং পরবর্তী বাজেটে তা বিবেচনায় নেওয়া হবে।

