বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ এখন অন্যতম আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একদিকে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) চূড়ান্ত হিসাব বলছে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে জিডিপির তুলনায় মোট বিনিয়োগের হার নেমে এসেছে ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশে। অন্যদিকে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সরকার এ হার ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশে উন্নীত করার উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ব্যবধান কেবল পরিসংখ্যানের পার্থক্য নয়। এটি বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরকারের প্রত্যাশার মধ্যকার দূরত্বকে স্পষ্ট করে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগে এমন বড় উল্লম্ফন অর্জন করা কঠিন এবং লক্ষ্যটি বেশ উচ্চাভিলাষী।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের চ্যালেঞ্জ। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে জরুরি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের মতে, শুধু বাজেটে উচ্চ লক্ষ্য নির্ধারণ করলেই বিনিয়োগ বাড়ে না। এর জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীল অর্থনীতি, সহজ ব্যবসা পরিবেশ এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা।
বিনিয়োগ কমার চিত্র:
বিবিএসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ২৮ দশমিক ৫৪ শতাংশে নেমে এসেছে। আগের অর্থবছরে এই হার ছিল ৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিনিয়োগ কমেছে ২ দশমিক ১৬ শতাংশ পয়েন্ট।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ, যা ২০২৪–২৫ অর্থবছরে কমে দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ০৩ শতাংশে। সরকারি বিনিয়োগও সামান্য কমেছে। এ হার নেমে এসেছে ৫ দশমিক ৮০ শতাংশে।
একই সময়ে সঞ্চয়ের হারেও পতন দেখা গেছে। দেশীয় সঞ্চয় কমে দাঁড়িয়েছে জিডিপির ২১ দশমিক ৯৮ শতাংশে, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ। জাতীয় সঞ্চয়ের হারও কমে ২৭ দশমিক ৬৭ শতাংশে নেমেছে।
সরকারের নতুন লক্ষ্য:
আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য ধরা হচ্ছে। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগ ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার একই সঙ্গে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, জিডিপির ১০ দশমিক ১৭ শতাংশ রাজস্ব আয় এবং ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ বাজেট ঘাটতির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে যাচ্ছে।
প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে দেশের জিডিপির আকার দাঁড়াবে ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকায়। সেই হিসাবে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ হবে ২১ লাখ ৪৫ হাজার ১৩৩ কোটি টাকা। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ ধরা হয়েছে, যা টাকার অঙ্কে ১৯ লাখ ৫৪ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা।
খাতভিত্তিক বিনিয়োগের চিত্র:
বেসরকারি খাতে ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ বিনিয়োগ ধরা হলে টাকার অঙ্কে তা দাঁড়াবে ১৭ লাখ ১ হাজার ৭৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এই খাতে লক্ষ্য ছিল ২৪ দশমিক ৭০ শতাংশ বা ১৫ লাখ ৪২ হাজার ৪১৬ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, সরকারি বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৫০ শতাংশ ধরা হলে তা দাঁড়াবে ৪ লাখ ৪৪ হাজার ৫৬ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে এই খাতে লক্ষ্য ছিল ৬ দশমিক ৬০ শতাংশ বা ৪ লাখ ১২ হাজার ১৪৪ কোটি টাকা অর্থাৎ, টাকার অঙ্কে সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও জিডিপির শতাংশের হিসাবে তা কিছুটা কম ধরা হচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ?
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের মূল ভিত্তি হলো বিনিয়োগ। নতুন কারখানা স্থাপন, অবকাঠামো নির্মাণ, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে বিনিয়োগ একটি দেশের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণকে এগিয়ে নেয়। বিশ্বের দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা বলছে, দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বা তারও বেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। এই হারকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে দেখা হয়।
বাংলাদেশে বিনিয়োগ কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে তরুণ প্রজন্মের ওপর। প্রতিবছর শ্রমবাজারে লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ যুক্ত হচ্ছেন। কিন্তু নতুন শিল্পকারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে না উঠলে তাদের জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি সম্ভব হচ্ছে না। ফলে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে। এর সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক বৈষম্যও আরও গভীর হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।
এদিকে সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এই বড় লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু লক্ষ্য নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে স্থিতিশীল অর্থনীতি, নীতিগত ধারাবাহিকতা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
বিনিয়োগ বাড়াতে কী করতে হবে?
বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু উচ্চ লক্ষ্য ঘোষণা যথেষ্ট নয়, বরং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন ছাড়া বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বিনিয়োগ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে—সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং নীতির ধারাবাহিকতা।
ড. জাহিদ হোসেনের মতে, অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর আস্থা না থাকলে বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হন না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে, ব্যাংকিং খাত দুর্বল থাকলে এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে বিনিয়োগ কমে যায়। তিনি আরও বলেন, বিনিময় হার নির্ধারণে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকা কী হবে, আর্থিক খাত সংস্কারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কী কর্মপরিকল্পনা রয়েছে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
এই অর্থনীতিবিদের মতে, বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট নানা প্রশাসনিক জটিলতা এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোম্পানি নিবন্ধন, জমি রেজিস্ট্রেশন, পরিবেশগত ছাড়পত্র, শ্রম আইন মানা—এসব প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি অনুমোদন পেতে ছয় থেকে সাত মাস পর্যন্ত সময় লেগে যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। এতে বিনিয়োগকারীদের বাড়তি খরচ ও হয়রানির মুখে পড়তে হয়।
তিনি বলেন, সরকার ‘ডিরেগুলেশন’ বা নিয়ন্ত্রক জটিলতা কমানোর কথা বললেও কোন ক্ষেত্রে কী ধরনের সংস্কার হবে, সে বিষয়ে পরিষ্কার রূপরেখা থাকা প্রয়োজন।
ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন নীতির স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিকতার ওপর। কোনো নীতি কতটা স্থায়ী এবং কখন পরিবর্তন হতে পারে—এ বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা থাকলে বিনিয়োগ বাড়ে।
তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে যদি একটি স্বচ্ছ সূত্র থাকে, তাহলে বিনিয়োগকারীরা আগেভাগেই সম্ভাব্য পরিবর্তন বুঝতে পারেন। একইভাবে ব্যাংক একীভূতকরণসহ অন্যান্য সংস্কার কর্মসূচির ক্ষেত্রেও ধারাবাহিকতা জরুরি।
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করতে আসন্ন বাজেটে একাধিক নীতিগত ও কাঠামোগত সংস্কারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। সরকারের লক্ষ্য হলো বিনিয়োগে থাকা প্রতিবন্ধকতা দূর করে অর্থনীতিকে আবার গতিশীল করা।
পরিকল্পনায় রয়েছে ডিরেগুলেশন কার্যক্রম গ্রহণের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমানো। পাশাপাশি আর্থিক খাত পুনর্গঠনের মাধ্যমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাজেটে কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন এবং সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। জনগণের দোরগোড়ায় উন্নত চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। সরকারি নীতিনির্ধারকদের ধারণা, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগের গতি বাড়বে এবং অর্থনীতি আবার উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরতে পারে।
তবে অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বল্প সময়ে মোট বিনিয়োগের হার জিডিপির ২৮ শতাংশ থেকে ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশে উন্নীত করা বাস্তবসম্মত নয়। তাঁর মতে, এটি একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য হলেও প্রথমে বিনিয়োগকে স্থিতিশীল পথে ফিরিয়ে আনা বেশি জরুরি। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এসব ঝুঁকি শুধু বাংলাদেশের নয়, বরং সব দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
তাই সরকারের উচিত এমন একটি নীতিগত পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও বিনিয়োগকারীরা আস্থার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারেন—এমনটাই মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ।

