ঈদুল আজহাকে ঘিরে নানামুখী বাড়তি কেনাবেচা দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে সাময়িক স্বস্তি এনে দিয়েছে। মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মানুষের আয়-ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে বাজারে টাকার প্রবাহও বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘদিন ধরে চাপের মুখে থাকা অর্থনীতি এই সময়টিতে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ পায়। তবে এই স্বস্তি স্থায়ী করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আগামী সপ্তাহে নতুন সরকারের প্রথম বাজেট ঘোষণা হতে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থনীতির অস্থিরতা কাটাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ঈদ অর্থনীতির সুফল কীভাবে সারা বছর ধরে রাখা যায়, সে বিষয়ে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধান খোঁজার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। একই সঙ্গে কুরবানির সময় চামড়া কেনাবেচায় সিন্ডিকেটের প্রভাব রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে। এসব তথ্য জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট খাতের একাধিক অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষক, যাদের বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে যুগান্তরে।
বিশ্লেষকদের মতে, কুরবানির ঈদে অর্থনীতিতে বাড়তি প্রবাহ মূলত তিনটি উৎস থেকে আসে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের ঈদ বোনাস, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এবং ঈদকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অতিরিক্ত আয়। এ সময় সবচেয়ে বেশি চাহিদা তৈরি হয় কুরবানিযোগ্য পশু—গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ও উট—এবং পোশাক, মসলা ও ইলেকট্রনিক পণ্যে।
এ ছাড়া কুরবানির মৌসুমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার চামড়ার বাজার তৈরি হয়। তবে এ বছরও সম্ভাবনাময় এই খাত সিন্ডিকেটের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যেকোনো উৎসব অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, কারণ এ সময় বিভিন্ন খাতে বিপুল অর্থ হাতবদল হয়। এতে যেমন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ে, তেমনি চাহিদাও বৃদ্ধি পায় এবং সরকারের রাজস্ব আয়েও প্রভাব পড়ে। সব মিলিয়ে এবারের ঈদ অর্থনীতি জনজীবনে সাময়িক হলেও স্বস্তি দিয়েছে।
উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএস-এর সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে. মুজেরী বলেন, কুরবানি শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাঁর মতে, এই প্রক্রিয়ায় নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হয়, বৈষম্য কমে এবং সম্পদের সুষম বণ্টনে সহায়তা করে।
তিনি আরও বলেন, কুরবানিকে কেন্দ্র করে পশু পালন ও ব্যবসার মাধ্যমে প্রতিবছর বহু মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে। দেশে বড় আকারের খামার গড়ে উঠেছে, পাশাপাশি ছোট উদ্যোক্তার সংখ্যাও বেড়েছে। অন্যান্য খাতেও এই সময় বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়। তবে বাড়তি অর্থ প্রবাহের কারণে কিছুটা মূল্যস্ফীতি দেখা দিলেও বাজারে নগদ টাকার উপস্থিতি থাকায় বড় ধরনের সংকট তৈরি হয় না। তাঁর মতে, সঠিক ব্যবস্থাপনা করা গেলে এই উৎসব অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, আগে থেকেই দুর্বল অবস্থায় থাকা অর্থনীতি বিভিন্ন বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবে আরও চাপে পড়ে। এর মধ্যেই ২৮ মে দেশে কুরবানির ঈদ অনুষ্ঠিত হয়। ঈদকে কেন্দ্র করে বোনাস, রেমিট্যান্স, পশু কেনাবেচা ও কেনাকাটার মাধ্যমে অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।
সরকারি ও বেসরকারি খাতে ঈদ বোনাসের মাধ্যমে কত অর্থ যুক্ত হয়, তার নির্দিষ্ট হিসাব নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী প্রায় ২০ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ঈদ বোনাস পান। দোকান, তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতসহ বেসরকারি পর্যায়ে আরও ৬০ লাখের বেশি শ্রমিক বোনাস পান। সব মিলিয়ে ৮০ লাখের বেশি মানুষ এই বোনাস সুবিধার আওতায় আসেন।
এ ছাড়া ঈদকে সামনে রেখে বড় অঙ্কের রেমিট্যান্সও দেশে আসে। কুরবানিকে কেন্দ্র করে ২৪ মে পর্যন্ত প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা স্থানীয় মুদ্রায় প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। ব্যাংকারদের ধারণা, পুরো মাস শেষে এই অঙ্ক সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এবার দেশে প্রায় ১ কোটি ১ লাখ পশু কুরবানি হয়েছে। তবে চূড়ান্ত হিসাব পেতে আরও সময় লাগবে। ব্যবসায়ীরা জানান, কুরবানির সময় প্রায় ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি চামড়া সংগ্রহ করা হয়, যা মোট চাহিদার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ।
চামড়া খাতের মোট বাজার মূল্যের একটি বড় অংশ এই মৌসুমেই নির্ভরশীল। ব্যবসায়ীদের মতে, মূল বাজার ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার হলেও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য লেনদেন মিলিয়ে এ খাতে মোট প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। তবে এবারও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার পেছনে সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে দেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ, রসুন ও আদার চাহিদা থাকলেও কুরবানির সময় এর ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। মসলাজাতীয় পণ্য যেমন এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, জিরা ও তেজপাতার ব্যবহারও এ সময় বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মসলা আমদানি হয়েছে, যা ঈদ বাজারে বড় ভূমিকা রাখে। এসব খাতে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কুরবানির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হলো কামারশিল্প। ছুরি, দা, বঁটি, চাপাতি, কুড়াল ও রামদা তৈরির এই বাজারও ঈদে সক্রিয় থাকে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই খাতের বাজার এক হাজার কোটি টাকার বেশি।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই-এর এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ঈদে পরিবহন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হয় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি ভ্রমণ ও বিনোদন খাতে ব্যয় হয় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। এসব ব্যয় মূল অর্থপ্রবাহের বাইরে অতিরিক্ত চাপ হিসেবে যুক্ত হয়, যা সামগ্রিক ঈদ অর্থনীতিকে আরও বিস্তৃত করে।
সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, কুরবানির ঈদ দেশের অর্থনীতিতে একদিকে স্বস্তির বাতাস আনলেও অন্যদিকে কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোও স্পষ্ট করে তুলছে। স্থায়ী সুফল পেতে এখন প্রয়োজন সুশৃঙ্খল নীতিগত পদক্ষেপ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনা।

