চলতি অর্থবছরে প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই পরিস্থিতির মধ্যেই আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য আরও বড় আকারের বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। ফলে নতুন অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানোর চাপ আরও তীব্র হতে যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে। এটি চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। বাজেটের আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় নির্বাহের জন্য রাজস্ব আয়ের ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়ছে।
নতুন অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। যা বর্তমান অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ দশমিক ২২ শতাংশ বেশি। এই রাজস্বের প্রায় ৮০ শতাংশ সংগ্রহের দায়িত্ব থাকবে এনবিআরের ওপর।
এ লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআরের একক রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। তবে চলমান অর্থনৈতিক চাপ, বাজারে মন্দাভাব এবং রাজস্ব আদায়ে বিদ্যমান ঘাটতির প্রেক্ষাপটে এই লক্ষ্য অর্জনকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার এই বৃহৎ বাজেটের ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আয়ই হবে প্রধান ভরসা। সে কারণে আগামী অর্থবছরে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে এনবিআরকে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘাটতির বৃত্তে এনবিআর: বাস্তবতা কতটা কঠিন?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের চিত্র বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে— লক্ষ্যমাত্রা ও প্রকৃত আদায়ের ব্যবধান কমার পরিবর্তে বছর বছর আরও বড় হচ্ছে। ফলে নতুন অর্থবছরের উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্য অর্জন নিয়ে প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে, অর্থাৎ এপ্রিল পর্যন্ত, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এনবিআরের রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এ সময়ে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এ সময়ে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৬০ শতাংশ।
বর্তমান পরিস্থিতিতে অর্থবছর শেষ হওয়ার আগের বাকি সময়ের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আরও প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করতে হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এমন অর্জন অত্যন্ত কঠিন।
এর আগেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাস শেষে রাজস্ব ঘাটতি ছিল প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা এবং প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ। পরবর্তী এক মাসে ঘাটতি আরও বেড়ে যাওয়ায় স্পষ্ট হয়েছে যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রা ও আদায়ের ব্যবধান আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
পেছনের বছরগুলোর তথ্যও একই ধরনের চিত্র তুলে ধরে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এনবিআর সংগ্রহ করতে পেরেছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা। ফলে ওই বছর রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়ায় ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। এরও আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ হলেও লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। সে বছর ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৮ হাজার ১৫৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
বর্তমান অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থনীতিবিদদের হিসাব অনুযায়ী, বাকি সময়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হবে। কিন্তু গত ২৫ বছরের ইতিহাস বলছে, এনবিআরের গড় রাজস্ব প্রবৃদ্ধি সাধারণত ১৫ থেকে ১৬ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে মোট রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে পৌঁছাতে পারে।
দীর্ঘমেয়াদি তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এনবিআর মাত্র একবার ২০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ২২ শতাংশ। সেই প্রেক্ষাপটে আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রয়োজনীয় প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধিকে অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক বাস্তবতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
২.৩৫ লাখ কোটি টাকার ঘাটতি, রাজস্ব আদায়ে বাড়ছে চাপ:
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হবে বিশাল বাজেট ঘাটতির অর্থায়ন। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতির পরিমাণ ধরা হচ্ছে প্রায় ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে দেশি ও বিদেশি উভয় উৎস থেকেই বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে আরও ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। অর্থাৎ বাজেট বাস্তবায়নে ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে যাচ্ছে।
তবে ঋণনির্ভর এই অর্থায়নের পাশাপাশি সরকারের জন্য আরও কয়েকটি বড় চাপ অপেক্ষা করছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়ন, বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধের বাড়তি দায়, ভর্তুকি ব্যয় এবং সম্ভাব্য নতুন বেতন কাঠামোর ব্যয়— সব মিলিয়ে নতুন অর্থবছরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা সহজ হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কর ফাঁকি এবং করজালের বাইরে থাকা বিপুল সংখ্যক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি পরিচালিত একটি গবেষণায় উঠে এসেছে, ২০২৩ সালে দেশে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই চিত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর ফাঁকির সুযোগ কমানো এবং করের আওতা সম্প্রসারণ ছাড়া রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব নয়। দেশের অনেক লাভজনক খাত এখনও কার্যকরভাবে কর ব্যবস্থার আওতায় আসেনি, যা রাজস্ব সংগ্রহে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চলতি অর্থবছর শেষে রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। সে হিসেবে আগামী অর্থবছরের জন্য নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা প্রকৃত আদায়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞদের প্রশ্ন, এই অতিরিক্ত রাজস্ব কোথা থেকে আসবে? সরকার কি একই করদাতাদের ওপর আরও চাপ বাড়াবে, নাকি নতুন করদাতা যুক্ত করে করভিত্তি সম্প্রসারণের পথে হাঁটবে?
তাদের মতে, রাজস্ব ব্যবস্থায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, কর নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, অটোমেশন ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন তথ্যভান্ডারের মধ্যে সমন্বিত সংযোগ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এতে আয় ও ব্যয়ের সামঞ্জস্য যাচাই সহজ হবে এবং কর ফাঁকির সুযোগও কমে আসবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায়ই হবে প্রধান ভরসা। কিন্তু বর্তমান লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যা অতীতের অভিজ্ঞতার তুলনায় অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আদায় না হলে সরকারকে ব্যয় সংকোচনের পথেই হাঁটতে হতে পারে। সেক্ষেত্রে কর অব্যাহতি কমানো, উন্নয়ন ব্যয়ের অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাস এবং রাজস্ব খাতের গভীর সংস্কার অপরিহার্য হয়ে উঠবে। সব মিলিয়ে আগামী অর্থবছরে এনবিআরের সামনে শুধু রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য পূরণ নয়, বরং দেশের সামগ্রিক আর্থিক ভারসাম্য রক্ষারও কঠিন পরীক্ষা অপেক্ষা করছে।

