বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে শুধু প্রবৃদ্ধির সংখ্যা বা বড় অবকাঠামো প্রকল্পের সাফল্য দিয়ে পুরো বাস্তবতা বোঝা সম্ভব নয়। বাইরে থেকে উন্নয়নের চিত্র যতটা উজ্জ্বল মনে হয়, ভেতরে ততটাই চাপ জমছে রাষ্ট্রীয় আয়, ব্যয়, ঋণ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর। বিশেষ করে বাজেট ঘাটতি, দুর্বল রাজস্ব আদায়, বাড়তে থাকা সরকারি ব্যয় এবং ঋণনির্ভর অর্থায়নের প্রবণতা এখন দেশের অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, সামাজিক নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ভর্তুকি, সরকারি বেতন-ভাতা এবং ঋণের সুদ পরিশোধে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে আসছে। এসব ব্যয়ের অনেকগুলোর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য সড়ক, রেল, বন্দর, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ অপরিহার্য। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন রাষ্ট্রের আয় সেই ব্যয়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ঠিক সেই চাপই ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে সরকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা থেকে ৭১,০০০ কোটি টাকার বেশি পিছিয়ে পড়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩.২৬ লাখ কোটি টাকার বেশি। এই ঘাটতি কেবল একটি হিসাবনিকাশের সমস্যা নয়; এটি দেশের কর কাঠামো, প্রশাসনিক দক্ষতা, কর সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির আনুষ্ঠানিকীকরণের দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে আসে। অর্থনীতি বড় হলেও সরকারের আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না—এটাই মূল উদ্বেগ।
বাংলাদেশ এখনো এশিয়ার অন্যতম কম কর-সক্ষম দেশের মধ্যে রয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় কর আদায়ের হার দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। এর পেছনে কয়েকটি বড় কারণ আছে। কর ফাঁকি, দুর্বল নজরদারি, প্রশাসনিক জটিলতা, করদাতার সীমিত সংখ্যা এবং বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি রাজস্ব আদায়কে সীমাবদ্ধ করে রেখেছে। দেশের বড় একটি অংশ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলেও তাদের আয়, লেনদেন ও উৎপাদন সরকারি কর কাঠামোর বাইরে থেকে যায়। ফলে সরকার বারবার একই সীমিত করদাতা গোষ্ঠী ও পরোক্ষ করের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়।
পরোক্ষ কর, বিশেষ করে মূল্য সংযোজন কর ও আমদানি শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ায়। কারণ এ ধরনের কর শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই পড়ে। একজন নিম্ন আয়ের মানুষ ও একজন উচ্চ আয়ের মানুষ একই পণ্যে একই হারে কর দেন—এতে করব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে বৈষম্যমূলক হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সরাসরি কর, বিশেষ করে আয়কর ও সম্পদভিত্তিক কর, তুলনামূলকভাবে ন্যায্য এবং কার্যকর হলেও বাংলাদেশে তা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়নি।
এদিকে ব্যয়ের চাপ কমছে না, বরং বাড়ছে। ভর্তুকি, ঋণের সুদ, সরকারি বেতন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্পে ব্যয় অব্যাহত আছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতাও এই চাপ আরও বাড়িয়েছে। জ্বালানির দাম, আমদানি ব্যয়, মুদ্রার বিনিময় হার, ভূরাজনৈতিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। ফলে একদিকে আয় কম, অন্যদিকে ব্যয়ের দায় বেশি—এই দ্বিমুখী চাপ অর্থনীতিকে কঠিন অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে সরকার ক্রমেই দেশীয় ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করছে, বিশেষ করে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। রাষ্ট্রের ঋণ নেওয়া নিজে কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। উন্নয়নশীল দেশগুলো বড় প্রকল্প, অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের জন্য ঋণ নেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই ঋণ কোথায় ব্যয় হচ্ছে এবং তার বিপরীতে ভবিষ্যতে কতটা অর্থনৈতিক সুফল আসবে।
যদি ঋণের অর্থ উৎপাদনশীল খাতে যায়, কর্মসংস্থান তৈরি করে, রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ায় এবং রাজস্ব আয় বাড়াতে সাহায্য করে, তবে সেই ঋণ দীর্ঘ মেয়াদে লাভজনক হতে পারে। কিন্তু যদি ঋণ ক্রমে নিয়মিত ব্যয়, ভর্তুকি, সুদ পরিশোধ বা পুরোনো দায় মেটাতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা অর্থনীতিকে একটি নির্ভরতার চক্রে ঠেলে দেয়। তখন নতুন ঋণ পুরোনো চাপ সামলানোর হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়, উন্নয়নের শক্তি হয়ে ওঠে না।
বর্তমানে ব্যাংক খাতে কিছু অতিরিক্ত তারল্য থাকায় সরকার সহজে ঋণ নিতে পারছে। বেসরকারি বিনিয়োগের চাহিদা তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকায় সরকারি ঋণ এখনই বড় তারল্য সংকট তৈরি করছে না। কিন্তু এই চিত্র দীর্ঘমেয়াদে একই থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অর্থনৈতিক পরিবেশ উন্নত হলে এবং বেসরকারি খাত আবার বিনিয়োগ বাড়াতে চাইলে ব্যাংকের অর্থের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়বে। তখন ব্যাংকগুলো ঝুঁকিমুক্ত সরকারি সিকিউরিটিতে বিনিয়োগকে বেশি নিরাপদ মনে করতে পারে। ফলে বেসরকারি শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং নতুন বিনিয়োগ ঋণ পেতে সমস্যায় পড়তে পারে। এতে সুদের হার বাড়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিদেশি অর্থায়নের ধীরগতি। বিদেশি ঋণ কমে যাওয়া মানেই যে ঋণের প্রয়োজন কমেছে, তা নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো বৈদেশিক ঋণের ছাড় কমছে, পুরোনো ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধ বাড়ছে এবং কম সুদের সুবিধাজনক ঋণ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। বাংলাদেশ ধীরে ধীরে এমন এক পর্যায়ে যাচ্ছে, যেখানে আগের মতো সহজ শর্তে বিদেশি ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে। ফলে দেশীয় ঋণের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
গত এক দশকে বাংলাদেশ অনেক বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এসব প্রকল্প দেশের যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, বাণিজ্য ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে একই সঙ্গে প্রকল্প বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষতার ঘাটতি ও শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্নও আছে। ঋণের অর্থ দিয়ে প্রকল্প করা হলে সেই প্রকল্পের প্রতিটি টাকা কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হলো, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ঋণ শেষ পর্যন্ত জনগণের অর্থ থেকেই পরিশোধ করতে হয়।
অর্থনীতির বর্তমান চাপ সামলাতে শুধু ঋণ বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার। প্রথমত, রাজস্ব ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। কর আদায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে, কর ফাঁকি কমাতে হবে, কর প্রশাসনকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে এবং অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, করব্যবস্থাকে আরও ন্যায্য করতে হবে। ভোক্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ না বাড়িয়ে উচ্চ আয়ের মানুষ, লাভজনক খাত এবং সম্পদশালী শ্রেণিকে যথাযথ কর কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।
তৃতীয়ত, সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান বাড়াতে হবে। কোন খাতে কত ব্যয় হচ্ছে, সেই ব্যয় থেকে কী ফল পাওয়া যাচ্ছে এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে কতটা স্বচ্ছতা আছে—এসব প্রশ্নকে নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আনতে হবে। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো, ভর্তুকিকে লক্ষ্যভিত্তিক করা এবং প্রকল্প বাছাইয়ে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যাচাই করা জরুরি।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো সম্ভাবনাময়। বড় শ্রমশক্তি, রপ্তানি খাত, প্রবাসী আয়, কৃষি উৎপাদন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ বাজার—সব মিলিয়ে দেশের সামনে সুযোগ আছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আর্থিক শৃঙ্খলা, ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজস্ব সংস্কার এবং সুশাসনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আজকের সতর্ক সংকেতকে যদি সময়মতো গুরুত্ব দেওয়া যায়, তাহলে এই চাপই ভবিষ্যৎ সংস্কারের সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি রাজস্ব দুর্বলতা, ব্যয়ের অদক্ষতা ও ঋণনির্ভরতা একইভাবে চলতে থাকে, তাহলে অর্থনীতির স্থিতিশীলতা আরও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বে। তাই এখন প্রশ্ন শুধু কত ঋণ নেওয়া হচ্ছে তা নয়; বড় প্রশ্ন হলো, সেই ঋণ ভবিষ্যৎ শক্তি তৈরি করছে, নাকি ভবিষ্যতের ওপর নতুন বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে তাই স্পষ্ট বার্তা—উন্নয়ন চালিয়ে যেতে হবে, কিন্তু তা হতে হবে দায়িত্বশীল, স্বচ্ছ ও টেকসই পথে। আয় বাড়ানো, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর সংস্কার এবং ঋণের সঠিক ব্যবহারই এখন অর্থনৈতিক স্থিতির সবচেয়ে জরুরি শর্ত।

