রাজস্ব আয় প্রত্যাশামতো না বাড়লে এবং বিদেশি সহায়তা ধীরগতিতে এলে সরকারের সামনে ব্যয় নির্বাহের পথ সীমিত হয়ে পড়ে। চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ সেই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই যাচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, সামাজিক ব্যয় এবং চলমান উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়ন—কোনোটিই থেমে থাকে না। কিন্তু আয়ের প্রধান উৎস রাজস্ব খাত যখন বড় ঘাটতিতে পড়ে, তখন বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারকে ব্যাংক খাতের দিকে বেশি ঝুঁকতে হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই ঋণনির্ভরতা এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে সরকার ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময়েই সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করেছে সরকারের ব্যাংকঋণ। এই চিত্র শুধু একটি হিসাবের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, ব্যয় কাঠামো এবং অর্থনৈতিক চাপের একটি বড় সংকেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঋণসংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের শুরুতে সরকারের ব্যাংকঋণের স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৫০ হাজার ৯০৫ কোটি টাকা। ১০ মাসের ব্যবধানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬০ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ সরকারের ঋণগ্রহণ শুধু স্বল্প সময়ের প্রয়োজন মেটানোর জন্য নয়, বরং সামগ্রিক অর্থায়ন কাঠামোর একটি বড় অংশ হয়ে উঠছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংক—দুই উৎস থেকেই ঋণ নেওয়া হয়েছে, তবে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর।
সরকারের প্রধান আয়ের উৎস রাজস্ব। কিন্তু চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে, অর্থাৎ এপ্রিল পর্যন্ত, সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এই সময়ে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। বিপরীতে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০.৬০ শতাংশ, কিন্তু লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় তা যথেষ্ট নয়।
অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে আরও ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় এই লক্ষ্য অর্জন প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্থরতা, আমদানি কমে যাওয়া, কর আহরণে কাঠামোগত দুর্বলতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা রাজস্ব প্রবাহকে প্রত্যাশিত মাত্রায় যেতে দিচ্ছে না। ফলে সরকারকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারের ব্যাংকঋণের বড় অংশ আসছে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে। ১০ মে পর্যন্ত সরকার যে ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক দিয়েছে মাত্র ৫ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ৪ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা এসেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে। অর্থাৎ সরকারের ব্যাংকঋণের প্রায় পুরো চাপ এখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর পড়ছে। সাধারণত ট্রেজারি বিল ও ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে এসব অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন টাকা সৃষ্টির ঝুঁকি থাকে। এতে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে সরাসরি বেশি ঋণ নেওয়া সব সময় সতর্কতার বিষয়। অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর হাতে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যেতে পারে। এটিই অর্থনীতির ভাষায় বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য একটি বড় উদ্বেগের জায়গা।
বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকায় এই চাপ হয়তো খুব বেশি দৃশ্যমান নয়। কিন্তু অর্থনীতি যদি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করে এবং উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকঋণ চাইতে থাকেন, তখন সরকারি ঋণের চাপ বেসরকারি খাতের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। ব্যাংকের তারল্য সীমিত হলে ঋণের সুদ বাড়তে পারে, ঋণ অনুমোদন কঠিন হতে পারে এবং নতুন শিল্প-ব্যবসার সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিনের বিশ্লেষণও একই দিকে ইঙ্গিত করে। তাঁর মতে, রাজস্ব আহরণে বড় ঘাটতি এবং প্রত্যাশিত বিদেশি বাজেট সহায়তা না পাওয়ার কারণে সরকার ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভর করছে। তবে এই প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ সরকার যদি ক্রমাগত ঋণ নিয়ে ব্যয় মেটায়, তাহলে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের দায় আরও বাড়বে।
সরকারি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ ব্যয়ও বাড়ে। বাজেটের একটি বড় অংশ তখন উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো বা উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় না হয়ে ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যায়। এতে সরকারের আর্থিক নমনীয়তা কমে যায়। বিশেষ করে ঋণের অর্থ যদি উৎপাদনশীল খাতে যথাযথভাবে ব্যবহার না হয়, তাহলে সেই ঋণ ভবিষ্যৎ আয়ের ভিত্তি তৈরি না করে বরং আর্থিক চাপ বাড়ায়। এ কারণেই ঋণের পরিমাণের পাশাপাশি ঋণের ব্যবহারও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
চলতি অর্থবছরে ব্যাংকঋণ বৃদ্ধির পেছনে আরও কিছু প্রেক্ষাপট রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সরকার প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল। এরপর ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সরকারকে রাজস্ব ঘাটতি, বৈদেশিক অর্থায়নে ধীরগতি, ভর্তুকির চাপ, ঋণের সুদ এবং উন্নয়ন ব্যয়ের মতো নানা আর্থিক বাস্তবতা সামলাতে হচ্ছে।
এর সঙ্গে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তাও যুক্ত হয়েছে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। জ্বালানি, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড় নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে সরকারের বৈদেশিক অর্থপ্রবাহের ওপরও চাপ তৈরি হয়। ফলে অভ্যন্তরীণ উৎস, বিশেষ করে ব্যাংক খাত, সরকারের কাছে দ্রুত অর্থায়নের প্রধান পথ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতি প্রায় ১১৩ বিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ঋণও দ্রুত বাড়ছে। অর্থনীতিবিদরা সাধারণত ঋণকে সরাসরি নেতিবাচক হিসেবে দেখেন না, যদি সেই ঋণ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয় এবং ভবিষ্যতে আয় সৃষ্টির সক্ষমতা তৈরি করে। কিন্তু ঋণের বড় অংশ যদি নিয়মিত ব্যয়, সুদ পরিশোধ বা ঘাটতি পূরণে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে সরকারের আর্থিক অবস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আয়ের ভিত্তি বাড়ানো। শুধু ঋণ নিয়ে বাজেট ঘাটতি সামাল দিলে সাময়িক স্বস্তি পাওয়া যায়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান আসে না। রাজস্ব আহরণ বাড়াতে কর প্রশাসনের দক্ষতা, করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি এবং আমদানি-নির্ভর রাজস্ব কাঠামো থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যয় ব্যবস্থাপনাও আরও স্বচ্ছ ও অগ্রাধিকারভিত্তিক হতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সরকারি অর্থায়নে নতুন চিন্তার প্রয়োজন আছে। সাধারণ ট্রেজারি বিল ও বন্ডের পাশাপাশি খাতভিত্তিক বা মন্ত্রণালয়ভিত্তিক বন্ড চালুর প্রস্তাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এতে কোন খাতে কত অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং তা কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সেটি আরও পরিষ্কারভাবে দেখা যাবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়লে ঋণের অর্থ ব্যবহারে দক্ষতাও বাড়তে পারে। শুধু ঋণ নেওয়া নয়, ঋণের অর্থ কোথায় যাচ্ছে এবং তা অর্থনীতিতে কী ফল দিচ্ছে—এই প্রশ্নগুলো এখন আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের ব্যাংকঋণ বৃদ্ধির বর্তমান চিত্র তাই কেবল একটি অর্থবছরের হিসাব নয়। এটি রাজস্ব ঘাটতি, ব্যয় চাপ, বৈদেশিক অর্থায়নের অনিশ্চয়তা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রতিফলন। অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই ব্যাংকঋণের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়া একটি সতর্কবার্তা। এখন প্রয়োজন এমন নীতি, যেখানে ব্যয় কমানোর নামে উন্নয়ন থেমে যাবে না, আবার ঋণনির্ভরতা এমন পর্যায়ে যাবে না যেখানে ভবিষ্যতের অর্থনীতি আরও ভারী হয়ে পড়ে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারের ব্যাংকঋণ বৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছে। রাজস্ব ঘাটতি পূরণ, বিদেশি সহায়তার ধীরগতি এবং চলমান ব্যয় নির্বাহের বাস্তবতায় ঋণ নেওয়া হয়তো আপাতত প্রয়োজনীয়। কিন্তু এই পথ দীর্ঘ হলে ব্যাংক খাত, বেসরকারি বিনিয়োগ, সুদের হার এবং ভবিষ্যৎ বাজেট ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ বাড়বে। তাই ঋণকে সাময়িক সহায়তা হিসেবে রেখে রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যয়ের অগ্রাধিকার ঠিক করা এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

