দেশে দীর্ঘ ২৭ মাস পর আবারও বিদ্যুতের খুচরা দাম বাড়ানো হলো। গ্রাহক পর্যায়ে প্রতি একক বিদ্যুতের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি এককে গড় বৃদ্ধি ১ টাকা ৫২ পয়সা। নতুন দর চলতি জুন মাসের ১ তারিখ থেকেই কার্যকর ধরা হয়েছে। ফলে জুন মাসের বিল থেকেই গ্রাহকদের বাড়তি ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বুধবার রাজধানীর রমনায় কমিশন কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নতুন মূল্যহার ঘোষণা করে। কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এই ঘোষণা দেন। শুধু খুচরা পর্যায় নয়, একই সঙ্গে পাইকারি বিদ্যুতের দাম এবং সঞ্চালন মাশুলও বাড়ানো হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে গড় মূল্য বেড়েছে ১৬.৬৮ শতাংশ, পাইকারি পর্যায়ে বেড়েছে ১৯.৮৫ শতাংশ এবং সঞ্চালন মাশুল বেড়েছে ২৩.৯৬ শতাংশ।
এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল বিদ্যুৎ বিলের অঙ্ক বাড়াবে, বিষয়টি এত সরল নয়। বিদ্যুৎ এখন ঘর, কৃষি, দোকান, কারখানা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস, যানবাহন চার্জিং—প্রায় সব ক্ষেত্রের মৌলিক ব্যয়। তাই বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব ধীরে ধীরে বাজারে, উৎপাদনে, সেবায় এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ছড়িয়ে পড়ে। এমন সময় এ সিদ্ধান্ত এলো, যখন সাধারণ মানুষ আগে থেকেই নিত্যপণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয় এবং জীবনযাত্রার খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
নতুন দর অনুযায়ী, খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের গড় মূল্য ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১০ টাকা ৬৩ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। আর পাইকারি পর্যায়ে বর্তমান গড় মূল্য ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ পাইকারি পর্যায়ে প্রতি এককে দাম বেড়েছে ১ টাকা ৩৯ পয়সা। সঞ্চালন মাশুলও ৩১.৩৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৩৮.৮৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্রয় ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যয় এবং বিদ্যুৎ খাতের সার্বিক আর্থিক চাপ বিবেচনা করেই নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, এই ব্যয়বৃদ্ধির দায় কতটা গ্রাহকের ওপর চাপানো হবে এবং কতটা নীতিগত সংস্কারের মাধ্যমে কমানো সম্ভব—এ প্রশ্ন এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থার মোট গ্রাহকসংখ্যা ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৪ হাজার ৪৮১। এর মধ্যে গৃহস্থালি গ্রাহক ৪ কোটি ২৫ লাখ ৭৪ হাজার ১২১। বিদ্যুৎ বিতরণ করছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতাধীন ৮০টি সমিতি, ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি, পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি এবং নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি।
সবচেয়ে উদ্বেগের জায়গা হলো নিম্ন আয়ের পরিবার। দেশে সীমিত ব্যবহারকারী গ্রাহকসংখ্যা ১ কোটি ৭৮ লাখ ৮২ হাজার ৩৮০। এর মধ্যে ১ কোটি ৬১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯১ গ্রাহকই পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের আওতায়। আবাসিক গ্রাহকদের প্রায় ৪২ শতাংশ এই শ্রেণির। সাধারণত মাসে ৫০ এককের মধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা পরিবারগুলোকে এই শ্রেণিতে ধরা হয়। এসব পরিবার কম আয়, অনিয়মিত আয়, কৃষি, দিনমজুরি বা অনানুষ্ঠানিক কাজের ওপর নির্ভরশীল। ফলে তাদের বিদ্যুৎ বিল সামান্য বাড়লেও মাসের শেষে সংসারের হিসাব বড়ভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
এই শ্রেণির গ্রাহকদের প্রতি একক বিদ্যুতের দাম ১৪.৯০ শতাংশ বাড়বে। ২০১০ সালের ১ মার্চ তারা প্রতি একক বিদ্যুতের জন্য ২ টাকা ৫০ পয়সা দিতেন। ২০২৬ সালের জুনে এসে সেই দর দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা ৩২ পয়সা। অর্থাৎ গত ১৬ বছরে সবচেয়ে কম ব্যবহারকারী গ্রাহকদের বিদ্যুৎ ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। যাদের বিদ্যুৎ ব্যবহার কম, সাধারণভাবে তারা তুলনামূলকভাবে কম সক্ষম পরিবার বলেই বিবেচিত। তাই এই শ্রেণির ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ সামাজিকভাবে সংবেদনশীল।
আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়েছে। ৫০ একক পর্যন্ত ব্যবহারকারীর মাসিক বিল প্রায় ৩৫ টাকা বাড়তে পারে। অন্যদিকে যারা আবাসিকে ৬০০ একক পর্যন্ত ব্যবহার করেন, তাদের বিল প্রায় ১ হাজার ৬৪৪ টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর সঙ্গে আনুপাতিকভাবে মূল্য সংযোজন করের অঙ্কও বাড়বে।
নতুন আবাসিক ধাপে দেখা যায়, ০ থেকে ৭৫ একক ব্যবহারকারীর বিদ্যমান দর ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে বেড়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা হয়েছে। ৭৬ থেকে ২০০ একক পর্যন্ত দর ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে বেড়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সা। ২০১ থেকে ৩০০ এককে ৭ টাকা ৫৯ পয়সা থেকে ৯ টাকা ১০ পয়সা। ৩০১ থেকে ৪০০ এককে ৮ টাকা ০২ পয়সা থেকে ৯ টাকা ৬২ পয়সা। ৪০১ থেকে ৬০০ এককে ১২ টাকা ৬৭ পয়সা থেকে ১৫ টাকা ০১ পয়সা। আর ৬০০ এককের বেশি ব্যবহারকারীদের জন্য বিদ্যমান ১৪ টাকা ৬১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা করা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যুতের ব্যবহার যত বেশি, ধাপভেদে দামও তত বেশি। তবে কম ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ওপরও এবার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তি চাপ পড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী পরিবারও মূল্যবৃদ্ধির বাইরে থাকছে না।
কৃষি খাতও নতুন দামের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। সেচ পাম্পে প্রতি একক বিদ্যুতের দাম ১৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৫ টাকা ২৫ পয়সা থেকে ৬ টাকা ০৪ পয়সা করা হয়েছে। কৃষি সেচে প্রতি এককে বাড়তি খরচ ৭৯ পয়সা। প্রথম দেখায় এই বৃদ্ধি খুব বড় মনে না হলেও কৃষির বাস্তবতায় এটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেচ খরচ সরাসরি উৎপাদন ব্যয়ের অংশ। ধান, সবজি, ফল বা অন্যান্য ফসল উৎপাদনে বিদ্যুৎনির্ভর সেচ ব্যবহৃত হলে কৃষকের খরচ বাড়বে। সেই খরচ শেষ পর্যন্ত খাদ্যপণ্যের দামে প্রতিফলিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কৃষি খাতের জন্য এই সিদ্ধান্ত আরও সংবেদনশীল, কারণ কৃষকের আয় অনেক সময় মৌসুমভিত্তিক এবং বাজারদরের ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কৃষক সব সময় পণ্যের ন্যায্য দাম পান না। ফলে বিদ্যুতের বাড়তি ব্যয় কৃষকের লাভ কমাতে পারে, আবার বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়লেও তার পুরো সুবিধা কৃষকের হাতে নাও যেতে পারে।
ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পেও বিদ্যুতের বাড়তি দাম সরাসরি প্রভাব ফেলবে। নিম্নচাপে ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের জন্য বেশি চাহিদার সময়ে প্রতি একক দর ১২ টাকা ৯৫ পয়সা থেকে বেড়ে ১৫ টাকা ২৭ পয়সা হয়েছে। কম চাহিদার সময়ে ৯ টাকা ৬৮ পয়সা থেকে বেড়ে ১১ টাকা ৪৫ পয়সা। নির্দিষ্ট একদর ১০ টাকা ৭৬ পয়সা থেকে বেড়ে ১২ টাকা ৭৩ পয়সা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পে নির্দিষ্ট একদরে বৃদ্ধি ১৮.৩০ শতাংশ।
বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পের বড় অংশ সীমিত পুঁজি, কম মুনাফা এবং স্থানীয় বাজারের ওপর নির্ভরশীল। তাদের উৎপাদন ব্যয় সামান্য বাড়লেও পণ্যের দাম বাড়ানো ছাড়া অনেক সময় উপায় থাকে না। কিন্তু দাম বাড়ালে ক্রেতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ফলে একদিকে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অন্যদিকে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়। এতে ছোট উদ্যোক্তা, কারখানা শ্রমিক এবং স্থানীয় অর্থনীতি চাপের মুখে পড়তে পারে।
বাণিজ্যিক ও অফিস খাতেও বিদ্যুতের দাম বেড়েছে। নিম্নচাপে বাণিজ্যিক ও অফিসের জন্য বেশি চাহিদার সময়ে প্রতি একক দর ১৫ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ১৮ টাকা ৪৩ পয়সা, কম চাহিদার সময়ে ১১ টাকা ৭১ পয়সা থেকে ১৩ টাকা ৮২ পয়সা এবং নির্দিষ্ট একদর ১৩ টাকা ০১ পয়সা থেকে ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে। দোকান, বিপণিবিতান, অফিস, সেবা প্রতিষ্ঠান—সব জায়গায় এর প্রভাব পড়বে। ব্যবসায়ীরা বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যয় পণ্য বা সেবার দামে যুক্ত করলে ভোক্তার খরচ আরও বাড়বে।
শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালের ক্ষেত্রেও নিম্নচাপে প্রতি একক দর ৭ টাকা ৫৫ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ০৫ পয়সা করা হয়েছে। হাসপাতালের মতো সেবামূলক খাতে বিদ্যুৎ ব্যয় বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। একইভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় বাড়লে তা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের ওপর পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে।
বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারি চার্জিং খাতেও নতুন দাম প্রযোজ্য হয়েছে। নিম্নচাপে নির্দিষ্ট একদর ৯ টাকা ৫৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে। কম চাহিদার সময়ে ৮ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে ১০ টাকা ২২ পয়সা, খুব কম চাহিদার সময়ে ৭ টাকা ৭১ পয়সা থেকে ৯ টাকা ০৯ পয়সা এবং বেশি চাহিদার সময়ে ১২ টাকা ১৪ পয়সা থেকে ১৪ টাকা ২০ পয়সা করা হয়েছে। এই খাতের ব্যয় বাড়লে ব্যাটারিচালিত যানবাহন ব্যবহারকারীদের পরিবহন খরচও বাড়তে পারে।
শিল্প খাতের ক্ষেত্রেও বাড়তি বিদ্যুৎ ব্যয় বড় উদ্বেগের বিষয়। উচ্চচাপ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বেশি চাহিদার সময়ে প্রতি একক দর ১৩ টাকা ৪৭ পয়সা থেকে ১৫ টাকা ৯৩ পয়সা, কম চাহিদার সময়ে ৯ টাকা ৬৯ পয়সা থেকে ১১ টাকা ৪৭ পয়সা এবং নির্দিষ্ট একদরে ১০ টাকা ৭৫ পয়সা থেকে ১২ টাকা ৭৫ পয়সা করা হয়েছে। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, ভোজ্যতেল, প্লাস্টিক, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াকরণসহ নানা উৎপাদন খাত বিদ্যুৎনির্ভর। তাই বিদ্যুৎ ব্যয় বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে এবং রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও চাপের মুখে পড়তে পারে।
পাইকারি বিদ্যুতের দাম ১৯.৮৫ শতাংশ বাড়ানোর পরও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ঘাটতি পূরণে সরকারকে বছরে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে কমিশনের চেয়ারম্যান জানিয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, পাইকারি দর প্রতি এককে গড়ে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বাড়ালে ১৪ হাজার ২০০ কোটি টাকা বাড়তি আয় হবে। তবু বছরে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি প্রয়োজন হবে।
এই তথ্য বিদ্যুৎ খাতের গভীর আর্থিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। দাম বাড়ানোর পরও যদি এত বড় ভর্তুকি প্রয়োজন হয়, তাহলে বোঝা যায় সমস্যা শুধু গ্রাহক পর্যায়ের দামে নয়; উৎপাদন কাঠামো, জ্বালানি আমদানি, অদক্ষতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা ব্যবহার, চুক্তি, সিস্টেম লস এবং পরিচালন ব্যবস্থার মধ্যেও বড় প্রশ্ন রয়েছে।
এর আগে ২০ ও ২১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি খুচরা পর্যায়ে প্রতি এককে ৮৫ পয়সা থেকে ২ টাকা ৫ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয়। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ৮৫ পয়সা, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড ১ টাকা ৭৭ পয়সা, ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ১ টাকা ৫৪ পয়সা, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি ১ টাকা ৯৮ পয়সা, পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি ১ টাকা ৩৯ পয়সা এবং নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি ২ টাকা ৫ পয়সা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিল।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়বে নিম্ন আয়ের ও কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী পরিবারের ওপর। কারণ এ ধরনের পরিবার সাধারণত মাসিক বাজেটের প্রতিটি খাত খুব হিসাব করে চালায়। বিদ্যুৎ বিল বাড়লে তাদের খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা বা যাতায়াত খরচে কাটছাঁট করতে হতে পারে। একই সঙ্গে উৎপাদন ব্যয় বাড়লে বাজারে পণ্যমূল্যও বাড়তে পারে, যা আবার একই পরিবারগুলোর ওপর দ্বিতীয় দফা চাপ তৈরি করবে।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের মতে, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। তাই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও গৃহস্থালি খাতে ব্যয় বাড়াবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই তার প্রভাব পড়বে। তারা আরও মনে করে, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, সিস্টেম লস ও ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলো সমাধান না করে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক গ্রাহকদের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানো ন্যায্য নয়।
এই মূল্যবৃদ্ধির আরেকটি বড় প্রভাব হতে পারে মূল্যস্ফীতিতে। বিদ্যুৎ খরচ বাড়লে কারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। পরিবহন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ, দোকান পরিচালনা—সব জায়গায় ব্যয় বাড়ে। ব্যবসায়ীরা সাধারণত এই বাড়তি ব্যয় পণ্য বা সেবার দামে যুক্ত করেন। ফলে বাজারে চাল, ডাল, তেল, সবজি, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পোশাক, গৃহস্থালি পণ্য—সবকিছুর দাম ধাপে ধাপে বাড়ার ঝুঁকি থাকে।
দামের চাপ কমাতে শুধু গ্রাহকের বিল বাড়ানো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কেন এত বেশি, কোন ধরনের জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বেশি, কোথায় অদক্ষতা রয়েছে, কোন কেন্দ্র কম ব্যবহার হয়েও বড় আর্থিক দায় তৈরি করছে—এসব প্রশ্নের জবাব জরুরি। একই সঙ্গে সিস্টেম লস কমানো, স্বচ্ছ ক্রয়নীতি, কার্যকর জ্বালানি পরিকল্পনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এ ক্ষেত্রে একটি সম্ভাবনাময় পথ হতে পারে। শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস এবং বড় ছাদসমৃদ্ধ স্থাপনাগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ালে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। এতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমবে এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে এর জন্য নীতিগত সহায়তা, সহজ ঋণ, প্রযুক্তিগত মান নিশ্চিতকরণ এবং গ্রাহকবান্ধব সংযোগ ব্যবস্থা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি বিল সংশোধনের ঘটনা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন, শিল্প প্রতিযোগিতা, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সরকার ভর্তুকির চাপ কমাতে চাইছে, কিন্তু সেই চাপ কতটা সাধারণ মানুষের কাঁধে যাবে এবং কতটা খাত সংস্কারের মাধ্যমে কমানো হবে—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।
বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে জরুরি হলো দরিদ্র ও সীমিত আয়ের গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, উৎপাদন ব্যয় কমানোর বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক অদক্ষতা দূর করা। অন্যথায় বিদ্যুৎ বিলের এই বৃদ্ধি বাজারে আরও বড় মূল্যচাপ তৈরি করতে পারে, যার শেষ ভার বহন করতে হবে সাধারণ ভোক্তাকেই।

