জাহাজ ভাঙার শিল্পকে শুধু পুরোনো জাহাজ কেটে ইস্পাত তৈরির ব্যবসা হিসেবে দেখলে গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটাই বাদ পড়ে যায়। এই শিল্প বাংলাদেশের ইস্পাত সরবরাহ, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে কিন্তু একই সঙ্গে এটি এমন এক শিল্প, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য হতে পারে একজন শ্রমিকের জীবন, উপকূলের পানি বা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য। ১৪ আগস্ট সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে একটি এলএনজি বহনকারী পুরোনো জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু সেই পুরোনো প্রশ্নটিকেই নতুন করে সামনে এনেছে।
একটি দুর্ঘটনা নয়, বড় ব্যবস্থার সংকেত
ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো কয়েক দিনের মধ্যেই আলোচনা থেমে যাবে। কিন্তু তার আগেই ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে অন্তত ২৮টি দুর্ঘটনার তথ্য প্রকাশ হয়েছিল। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের ওই প্রতিবেদনে তিনজন শ্রমিকের মৃত্যু, ১০ জনের গুরুতর আহত এবং ১৫ জনের মাঝারি মাত্রায় আহত হওয়ার কথা বলা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধেও ৩২টি দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত ও ৩৮ জন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু ‘কেন একটি দুর্ঘটনা ঘটল’ নয়; বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, একই ধরনের ঝুঁকি বারবার তৈরি হচ্ছে কেন?
এর উত্তর খুঁজতে গেলে আগে বুঝতে হবে, একটি পুরোনো জাহাজের ভেতরে আসলে কী থাকে। জাহাজের ইস্পাতই সবচেয়ে মূল্যবান অংশ, কিন্তু তার সঙ্গে থাকতে পারে অ্যাসবেস্টস, পলিক্লোরিনেটেড বাইফেনাইল বা পিসিবি, ভারী ধাতু, তেলজাত বর্জ্য, ক্ষতিকর রং এবং অন্যান্য বিপজ্জনক উপাদান। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও বাসেল কনভেনশনের নথিতেও পুরোনো জাহাজে থাকা এসব উপাদানের স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকির কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আসলে শুধু ধাতু পুনরুদ্ধারের কাজ নয়; এটি একই সঙ্গে বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজও।
তেজস্ক্রিয়তার চেয়েও বড় যে বাস্তবতা
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। জাহাজভাঙা শিল্পকে ‘তেজস্ক্রিয় জাহাজের ভাগাড়’ হিসেবে দেখানো অতিরঞ্জিত হতে পারে। পুরোনো জাহাজে বিভিন্ন বিপজ্জনক উপাদান থাকার প্রমাণ শক্তিশালী হলেও সব জাহাজই উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় পদার্থ বহন করে এমন দাবি করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তবে বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা এলাকার মাটিতে বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় নিউক্লাইডের উপস্থিতি পরিমাপ করা হয়েছে এবং আরও নিয়মিত রেডিওলজিক্যাল পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। ফলে আলোচনাটি ‘তেজস্ক্রিয় জাহাজ’ বনাম ‘তেজস্ক্রিয়তা নেই’ এই দুই চরম অবস্থানের মধ্যে আটকে না রেখে বৈজ্ঞানিক পরিমাপ ও নিয়মিত নজরদারির ভিত্তিতে হওয়াই যুক্তিযুক্ত।
বরং যে ঝুঁকির প্রমাণ আরও পরিষ্কার, সেটি হলো রাসায়নিক ও ভারী ধাতুর দূষণ। সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় এলাকায় করা গবেষণায় পানিতে ও তলানিতে সীসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, পারদ ও ক্রোমিয়ামের মতো বিষাক্ত ধাতুর উপস্থিতি এবং পরিবেশগত ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে। ২০২৫ সালের আরেক গবেষণায় জাহাজভাঙা এলাকার পানিতে সীসা, তামা, ক্যাডমিয়াম, পারদ, জিংক, ক্রোমিয়াম ও আর্সেনিকের মাত্রা পরীক্ষা করে অধিকাংশ নমুনায় পরিবেশ অধিদপ্তরের মানদণ্ড অতিক্রম করার তথ্য পাওয়া যায়। একইভাবে তলানিতে ক্ষতিকর পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতিও গবেষণায় শনাক্ত হয়েছে।
তাহলে শিল্পটি বন্ধ করে দেওয়া কি সমাধান?
এখানেই আলোচনাটি একটু কঠিন। কারণ জাহাজভাঙা শিল্পকে এক কথায় ‘খারাপ শিল্প’ বললে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে। বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশের এই খাতের বার্ষিক পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা ১ কোটি টনের বেশি এবং ৩০০টিরও বেশি রি-রোলিং মিল এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। বোর্ডের হিসাবে শিল্পটি দেশের বার্ষিক লোহার চাহিদার প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ পূরণে ভূমিকা রাখে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করে। জাতিসংঘ বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, ২০২৫ সালে বিশ্বের জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের প্রায় ৮০ শতাংশ ভারত, বাংলাদেশ ও তুরস্কে হয়েছে।
তাই প্রশ্নটা হওয়া উচিত না, জাহাজভাঙা শিল্প থাকবে কি থাকবে না। আসল প্রশ্ন হলো, কী ধরনের জাহাজভাঙা শিল্প বাংলাদেশে থাকবে? এমন একটি শিল্প, যেখানে কম খরচের শ্রম ও দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থাই প্রতিযোগিতার সুবিধা? নাকি এমন একটি শিল্প, যেখানে নিরাপদ ইয়ার্ড, বিপজ্জনক পদার্থ শনাক্তকরণ, প্রশিক্ষিত শ্রমিক, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত নজরদারি ব্যবসার অবিচ্ছেদ্য অংশ? আন্তর্জাতিকভাবে এর উত্তর ইতিমধ্যে অনেকটাই স্পষ্ট। ২০২৫ সালের ২৬ জুন হংকং কনভেনশন কার্যকর হয়েছে, যার লক্ষ্যই হলো জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণকে নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত করা। বাংলাদেশও এই কনভেনশনের অংশ।
আইন আছে, এখন প্রশ্ন প্রয়োগের
বাংলাদেশ ২০১৮ সালে জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন করেছে এবং ২০২০ সালে ১৪ সদস্যের বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড গঠন করেছে। আইনের উদ্দেশ্যের মধ্যেই নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিধি বাস্তবায়নের বিষয় রয়েছে। বর্তমানে বোর্ডই ইয়ার্ড নিবন্ধন, লাইসেন্স, পরিদর্শন ও ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ সনদ দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে। অর্থাৎ সমস্যাটি পুরোপুরি আইনহীনতার নয়। বরং বড় প্রশ্ন হলো আইন ও সনদের শর্তগুলো মাঠে কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এই জায়গাতেই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ শব্দটি শুনলেই যদি আমরা ধরে নিই যে সেখানে দুর্ঘটনা ঘটবে না, তাহলে ভুল হবে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে একটি গ্রিন-সার্টিফায়েড ইয়ার্ডে শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা নিয়েও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। আর ২০২৬ সালের দুর্ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে, কাগজে মানদণ্ড পূরণ করা এবং প্রতিদিনের কাজে সেই মানদণ্ড বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাও বহু বছর ধরে বলে আসছে, জাহাজভাঙা বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ কাজ; নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা, ঝুঁকিপূর্ণ কাজের নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এই শিল্পকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
লাভের হিসাবের বাইরে আরেকটি হিসাব আছে
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ তাই শিল্প বন্ধ করা নয়, বরং এর ব্যবসায়িক মডেল বদলে দেওয়া। একটি জাহাজ কম খরচে ভাঙা গেলেই সেটি অর্থনৈতিকভাবে সবচেয়ে লাভজনক সিদ্ধান্ত এমন ধারণা এখন আর টেকসই নয়। কারণ দুর্ঘটনায় শ্রমিক মারা গেলে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, পরিবার আয় হারায়, উৎপাদন বন্ধ হয়, পরিবেশ দূষিত হলে তার মূল্য সমাজকে বহন করতে হয়। আরও বড় বিষয় হলো, দূষিত উপকূল, পানি ও মাটির দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির দাম সাধারণত কোনো ইয়ার্ডের হিসাবের খাতায় দেখা যায় না। কিন্তু সেই দাম শেষ পর্যন্ত মানুষকেই দিতে হয়।
বিশ্বব্যাপী জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের বড় অংশ দক্ষিণ এশিয়ায় হওয়া নিজেই প্রমাণ করে যে শিল্পটির অর্থনৈতিক যুক্তি আছে। কিন্তু একই সঙ্গে ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ভাঙা ৩২১টি জাহাজের ২১৪টিই দক্ষিণ এশিয়ায় গেছে এবং ওই অঞ্চলে অন্তত ১১ শ্রমিকের মৃত্যু ও ৬২ জনের আহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে এনজিও শিপব্রেকিং প্ল্যাটফর্ম। অর্থাৎ কম খরচের সুবিধার সঙ্গে নিরাপত্তার ঘাটতির সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
সবশেষে আমাদের একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন করতেই হবে বাংলাদেশ কি শুধু বিশ্বের পুরোনো জাহাজের জন্য সস্তা শেষ ঠিকানা হতে চায়, নাকি নিরাপদ ও আধুনিক জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের একটি প্রতিযোগিতামূলক কেন্দ্র হতে চায়? দ্বিতীয় পথটি কঠিন, ব্যয়বহুল এবং শুরুতে হয়তো মুনাফাও কিছুটা কমাবে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটাই টেকসই ব্যবসা। হংকং কনভেনশনের যুগে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ শুধু একটি সনদ বা সাইনবোর্ডের বিষয় হতে পারে না; এটি হতে হবে শ্রমিকের নিরাপত্তা, বিপজ্জনক পদার্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা, উপকূলের পরিবেশ এবং মালিকের জবাবদিহির বাস্তব ব্যবস্থা।
কারণ শেষ পর্যন্ত একটি শিল্প কত টন ইস্পাত উদ্ধার করল, কত ডলার আয় করল বা কত মানুষকে কাজ দিল এসব হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তার পাশে আরেকটি হিসাবও রাখতে হবে: এই লাভ করতে গিয়ে কতটা ঝুঁকি আমরা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলাম? সেই হিসাব যদি ব্যবসার খাতায় না থাকে, তবুও প্রকৃতি ও সমাজের খাতায় তা জমা হয়। আর সেই বিল একদিন না একদিন পরিশোধ করতেই হয়।

