মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে চলমান অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যে দেশের গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে নতুন করে পাঁচ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণ এবং সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় এই পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, পাঁচ কার্গো এলএনজির মধ্যে দুই কার্গো আনা হবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সরাসরি চুক্তির মাধ্যমে। বাকি তিন কার্গো সংগ্রহ করা হবে আন্তর্জাতিক কোটেশন আহ্বানের প্রক্রিয়ায়। আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে এই তিন কার্গো এলএনজি আমদানিতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে একটি কার্গো সরবরাহ করবে সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান এবং দুটি কার্গো সরবরাহ করবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি জ্বালানি কোম্পানি। বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে এলএনজির দামের ওপর। ফলে কয়েক মাস আগের তুলনায় এখন একই পরিমাণ গ্যাস আমদানি করতে সরকারকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এর আগেও সরকার ধারাবাহিকভাবে এলএনজি আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। সর্বশেষ ক্রয় কমিটির বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যের দুটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তিন কার্গো এলএনজি কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। ওই চালানগুলোর জন্য মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৩৩০ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
এরও আগে গত ৭ মে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে তিন কার্গো এলএনজি কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন তিনটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে এলএনজি সংগ্রহের জন্য মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ১৮৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। তুলনামূলকভাবে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক অনুমোদিত চালানগুলোর ক্ষেত্রে ব্যয় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা পরিচালনা এবং গৃহস্থালি ব্যবহারের বড় একটি অংশ প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ক্রমাগত কমে আসায় আমদানিকৃত এলএনজির গুরুত্ব গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশই বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজির মাধ্যমে পূরণ করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়। তাই আগাম প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনীয় জ্বালানি মজুত ও আমদানির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
তবে এলএনজি আমদানির ক্রমবর্ধমান ব্যয় নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। কারণ উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানি করলে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ে, একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে একই বৈঠকে কৃষি ও অবকাঠামো খাতের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রয় প্রস্তাবও অনুমোদন পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪০ হাজার টন বাল্ক গ্র্যানুলার ইউরিয়া সার সংগ্রহ, দুটি জেলায় ৫৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ক্রয় এবং ৫০ কেজি ধারণক্ষমতার এক কোটি নতুন বস্তা কেনা।
সব মিলিয়ে সরকার একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে কৃষি ও অবকাঠামো খাতের প্রয়োজনীয় সরবরাহও সচল রাখতে পদক্ষেপ নিচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকরা।

