বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আগামী ১১ জুন বর্তমান সরকারের প্রথম জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করতে যাচ্ছেন। এ বাজেট ঘিরে প্রত্যাশাও অনেক। কারণ, কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন অর্থনৈতিক সময়ের একটিতে দাঁড়িয়ে আছে দেশ। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, বিনিয়োগ দুর্বল হয়েছে, দারিদ্র্য বেড়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকট ও উচ্চ জ্বালানি ব্যয় উৎপাদন ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ব্যাংকিং খাতও এখনো নানা সংকটে জর্জরিত।
এদিকে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে, যা একদিকে নতুন সুযোগ তৈরি করবে, অন্যদিকে নতুন চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসবে। এমন বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু নিয়মিত বার্ষিক আর্থিক পরিকল্পনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হতে হবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনরুদ্ধার, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং এলডিসি-পরবর্তী প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির জন্য দেশকে প্রস্তুত করার একটি রোডম্যাপ।
গত কয়েক বছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করছে। অন্যদিকে চলতি বছরের মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা এপ্রিলে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। এ বৃদ্ধির পেছনে মূলত খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির প্রভাব রয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ফল হতে পারে।
বিনিয়োগ কম থাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি দুর্বল। ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দুর্বল হলেও পণ্যমূল্য উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। আর যখন অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন বৈদেশিক ঝুঁকির প্রভাবও বেশি অনুভূত হয়।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার ২০২৭ অর্থবছরের জন্য একটি বড় ও সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রস্তাব করতে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি হতে পারে। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হতে পারে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে আগামী কয়েক বছরে অর্জনের জন্য বিভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অর্থনীতিকে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে এনে কর্মসংস্থান ও আয় বাড়ানো জরুরি। তবে তা অর্জনের জন্য কয়েকটি মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হবে।
প্রথমত, উচ্চ প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের গতির ওপর। উচ্চ সুদহার, জ্বালানি সংকট, নীতিগত অনিশ্চয়তা, দুর্বল সুশাসন, বকেয়া পরিশোধে বিলম্ব এবং ব্যাংকিং খাতের চাপের কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। ২০২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির মাত্র ২২ শতাংশ ছিল। দেশের ক্রমবর্ধমান শ্রমশক্তির জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এই হার যথেষ্ট নয়।
তাই ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও অনিশ্চয়তা কমাতে সরাসরি সহায়ক পদক্ষেপকে বাজেটে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে শিল্পখাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ, দ্রুত কাস্টমস ছাড়পত্র, সময়মতো ভ্যাট ও শুল্ক ফেরত, বন্দর ব্যবস্থার উন্নয়ন, ব্যবসা পরিচালনার বিধি সহজ করা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই) লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা। তৈরি পোশাক খাতের বাইরে ওষুধ, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, চামড়াজাত পণ্য এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পের মতো খাতগুলোকেও এগিয়ে নিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানি খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা প্রয়োজন। বর্তমানে জ্বালানির ঘাটতি ও উচ্চ মূল্য শিল্প উৎপাদন, কৃষি, রপ্তানি, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর উন্নয়ন, সিস্টেম লস কমানো এবং বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর দক্ষতা ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে, বিশেষ করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান এবং জ্বালানি দক্ষতা বৃদ্ধিতে আরও বিনিয়োগ প্রয়োজন। স্থাপিত বিদ্যুৎ সক্ষমতার পরিবর্তে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। এতে মূল্যস্ফীতি কমবে, বিনিয়োগ বাড়বে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।
তৃতীয়ত, সরকারি ব্যয়ের গুণগত মান উন্নত করতে হবে। শুধু বড় আকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) গ্রহণ করলেই প্রবৃদ্ধি বাড়বে না। প্রকল্প নির্বাচন করতে হবে বাস্তবায়ন প্রস্তুতি, কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা, আমদানি সাশ্রয় এবং উৎপাদনশীলতায় অবদানের ভিত্তিতে। ধীরগতির ও কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলো স্থগিত রাখা উচিত।
বাজেটে কৃষি, সেচ, সংরক্ষণ সুবিধা, পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জলবায়ু সহনশীলতায় বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। এসব খাত সরাসরি উৎপাদনশীলতা ও জনকল্যাণে অবদান রাখতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো সামাজিক অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
তবে বরাদ্দ বাড়ালেই যে অবকাঠামোর মান উন্নত হবে, তা নয়। ভৌত ও সামাজিক—উভয় ধরনের অবকাঠামো খাতে ব্যয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করতে হবে।
একটি সম্প্রসারণমূলক বাজেট প্রণয়নের সময় সরকার অন্যান্য জরুরি বিষয়েও যথাযথ গুরুত্ব দেবে বলে আশা করা যায়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ বাড়াতে সহায়ক ব্যয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অর্থাৎ খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, সার, সেচ, জ্বালানি সরবরাহ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ব্যয় বাড়াতে হবে। অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় নির্মাণ, প্রশাসনিক সম্প্রসারণ এবং কম ফলদায়ক প্রকল্পে ব্যয় কমানো উচিত।
নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, সার ও ওষুধের ওপর আরোপিত আমদানি শুল্ক ও কর পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন, যাতে বাজেটের কারণে বাজারদর আরও না বাড়ে। একই সঙ্গে মজুতদারি, কারসাজি ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে।
সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগ এখন ক্রয়ক্ষমতা। জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লেও যদি প্রকৃত আয় কমতে থাকে, তাহলে তার সুফল জনগণ পাবে না। তাই বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আয় সুরক্ষার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
প্রস্তাবিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি সঠিকভাবে লক্ষ্যভিত্তিক ও আর্থিকভাবে টেকসই হলে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সহায়ক হতে পারে। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নে পরিচ্ছন্ন উপকারভোগী ডাটাবেস, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে সহায়তা প্রকৃত দরিদ্র, নিম্নআয়ের পরিবার, প্রান্তিক কৃষক ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কাছে পৌঁছায়।
কর্মসংস্থান ও মজুরি সহায়তার মাধ্যমেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। এজন্য গ্রামীণ ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় শ্রমনির্ভর জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি সম্প্রসারণ, এসএমই খাতকে সহায়তা, নারীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
যেখানে প্রয়োজন, সেখানে নিম্ন মজুরির খাতগুলোর ন্যূনতম মজুরি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ভাতা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয় করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং ডিজিটাল কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতেও বাজেট সহায়ক হওয়া দরকার। যেসব বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, সেগুলোকে শুধু অবকাঠামো সম্প্রসারণমূলক বিনিয়োগের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
বাজেটে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও এড়িয়ে চলতে হবে। সরকার যদি ব্যাপকভাবে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করে, তাহলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হবে এবং সুদের ব্যয় বাড়বে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাবে।
তাই উচ্চ মুনাফা-সক্ষম প্রকল্পে স্বল্পসুদে বৈদেশিক অর্থায়ন বাড়ানো, রাজস্ব আদায় উন্নত করা, অপচয় কমানো এবং ভর্তুকি ব্যবস্থাপনায় আরও স্বচ্ছতা আনা প্রয়োজন।
আসন্ন বাজেটে দারিদ্র্যের উদ্বেগজনক ঊর্ধ্বগতির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন হিসাব বলছে, দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি, দুর্বল কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে মহামারির আগের সময়ের তুলনায় দারিদ্র্য বেড়েছে। খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার ব্যয় বহন করতে এখনো অনেক পরিবার হিমশিম খাচ্ছে।
২০২৭ অর্থবছরের বাজেট বর্তমান সরকারের প্রথম বড় অর্থনৈতিক নীতিগত ঘোষণা। এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির প্রতি সরকারের অঙ্গীকার তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
সবশেষে, বাজেটের সাফল্য তার আকার বা ঘোষিত প্রকল্পসংখ্যা দিয়ে বিচার করা হবে না। বরং এটি মূল্যায়িত হবে—বাজেট কতটা কার্যকরভাবে মূল্যস্ফীতি কমাতে পারে, রাজস্ব আহরণ জোরদার করতে পারে, বিচক্ষণ সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারে, বিনিয়োগ পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে এবং বাংলাদেশকে আরও প্রতিযোগিতামূলক ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে পারে—তার ভিত্তিতে।

