বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি, জলবায়ু ঝুঁকি, নগর দরিদ্রতা, বেকারত্ব, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে সামাজিক সুরক্ষার প্রচলিত কাঠামো এখন আর যথেষ্ট নয়। তাই আসন্ন জাতীয় বাজেট শুধু ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা নয়, বরং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার গভীর সংস্কারের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি মূলত দরিদ্র মানুষের জন্য আর্থিক সহায়তা বা ভাতা প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় মানুষের ঝুঁকির ধরন বদলে গেছে। একটি অসুস্থতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা চাকরি হারানোর ঘটনাই অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে। ফলে সামাজিক সুরক্ষাকে এখন কেবল কল্যাণমূলক কর্মসূচি নয়, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে জিডিপির তুলনায় সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় এখনও অনেক কম। এর ফলে অনেক কর্মসূচি থাকলেও সেগুলোর সুবিধা সীমিত এবং প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় অপর্যাপ্ত। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে স্থির ভাতার প্রকৃত মূল্যও কমে যায়, যার প্রভাব পড়ে খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর।
সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে হলে নগর দরিদ্র, অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক, নারী, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীকে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু নগদ সহায়তা নয়, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিশুযত্ন এবং পুনর্বাসন সেবার সঙ্গে এসব কর্মসূচির সমন্বয় প্রয়োজন।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর। অথচ সামাজিক বিমা ব্যবস্থা এখনও সীমিত। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য বিমা, বেকার ভাতা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং পেনশন ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
নারীদের জন্যও আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। কারণ তারা মজুরি বৈষম্য, অবৈতনিক পরিচর্যা কাজ এবং কর্মক্ষেত্রের নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হন। তাই নিরাপদ পরিবহন, শিশুযত্ন কেন্দ্র, মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা এবং প্রবীণ বয়সে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সামাজিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও নতুন ধরনের সামাজিক সুরক্ষা প্রয়োজন। শুধু দুর্যোগ-পরবর্তী ত্রাণ নয়, আগাম সহায়তা, জীবিকা পুনর্গঠন এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে সুশাসন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। স্বচ্ছ ডাটাবেজ, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নিশ্চিত না হলে কোনো সংস্কারই কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
সম্প্রতি পরীক্ষামূলকভাবে চালু হওয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে। যদি এটি একটি সমন্বিত সামাজিক নিবন্ধন ব্যবস্থা হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে বিচ্ছিন্ন কর্মসূচিগুলোর পরিবর্তে একক ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো তৈরি করা সম্ভব হবে।
সামনের দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দারিদ্র্যভিত্তিক সীমিত সহায়তা থেকে বেরিয়ে জীবনচক্রভিত্তিক, অধিকারভিত্তিক এবং ঝুঁকিনির্ভর আধুনিক কাঠামোয় রূপান্তর করা এখন সময়ের দাবি।

