দেশের বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে আবারও বাজার থেকে মার্কিন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) দুটি বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্রয়ের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, তারা একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে চায়, অন্যদিকে ডলারের বিনিময় হারকেও একটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে রাখতে আগ্রহী।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মাল্টিপল প্রাইস অকশন পদ্ধতিতে এই ডলারগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতি ডলারের বিপরীতে ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে ডলারের ওপর চাপ কমেছে এবং বাজারে একটি স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে রিজার্ভে যুক্ত করছে।
পরিসংখ্যান বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে মোট ৬৪১ কোটি ৬৫ লাখ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৬ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে শুধু জুন মাসের প্রথম চার দিনেই কেনা হয়েছে ১০ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার বা ১০১ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ নতুন অর্থবছর সামনে রেখে রিজার্ভ বাড়ানোর কৌশলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেশ সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়ে গেলে তার দাম দ্রুত কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে রপ্তানিকারক ও প্রবাসীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন, কারণ তারা বিদেশ থেকে আয় এনে স্থানীয় মুদ্রায় তুলনামূলক কম অর্থ পান। ফলে দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি ও প্রবাসী আয়ের প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এই কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার কিনে বিনিময় হারকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রাখার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সুফল রয়েছে। প্রথমত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের আমদানি ব্যয় ও আন্তর্জাতিক লেনদেন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে। দ্বিতীয়ত, ডলারের দামে অতিরিক্ত ওঠানামা কমে আসবে, যা ব্যবসায়ী, আমদানিকারক, রপ্তানিকারক এবং সাধারণ বাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংককে রিজার্ভ থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিক্রি করতে হয়েছিল। তবে চলতি অর্থবছরে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি, রপ্তানি খাতের পুনরুদ্ধার এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতার কারণে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিক্রেতার ভূমিকায় নয়, বরং ক্রেতার ভূমিকায় ফিরে এসেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি প্রবাসী আয় ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী মাসগুলোতেও বাংলাদেশ ব্যাংক বাজার থেকে ডলার সংগ্রহের কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পারে। এতে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

