উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে দেশের নীতিনির্ধারণী সুদহার বা পলিসি রেট কমানোর পক্ষে নন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত বর্তমান ১০ শতাংশ পলিসি রেট বহাল রাখা উচিত। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে এমন পরামর্শ দিয়েছেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘মানিটরি পলিসি কনসাল্টেশন মিটিং’-এ গভর্নরের সঙ্গে দেশের কয়েকজন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার মতবিনিময় করেন। বৈঠকে আগামী জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের জন্য প্রণয়নযোগ্য মুদ্রানীতির বিষয়ে তাদের মতামত জানতে চান গভর্নর।
আলোচনায় অংশ নেওয়া অর্থনীতিবিদরা বলেন, বর্তমানে মূল্যস্ফীতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। এ অবস্থায় পলিসি রেট কমিয়ে দিলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়তে পারে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করবে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে তারা মত দেন।
তাদের মতে, সম্প্রতি জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও অর্থনীতিতে পড়বে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি এর প্রভাব ভোগ্যপণ্যের বাজারেও প্রতিফলিত হতে পারে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। এ কারণেই বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানকে বর্তমান সময়ে পলিসি রেট না কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
বৈঠকে অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তাদের মতে, উৎপাদন বৃদ্ধি, রপ্তানি সহায়তা, বেসরকারি খাতের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে এ তহবিল কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে প্রণোদনার অর্থ বণ্টনে কঠোর নজরদারিরও প্রয়োজন রয়েছে বলে মত দেন তারা। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রণোদনা বিতরণে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, সেসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
অর্থনীতিবিদরা আরও বলেন, শুধু মুদ্রানীতি নয়, রাজস্ব নীতির সঙ্গেও কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে। এ দুই নীতির মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকলে পলিসি রেট বাড়ানো বা কমানোর কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে। পাশাপাশি বাজার তদারকি জোরদার না করলে উচ্চ সুদহারও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারবে না বলে তারা মন্তব্য করেন।
বৈঠকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের ধীরগতির বিষয়টিও উঠে আসে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যবসা সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ এবং তার কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। তারা ব্যাংকিং খাতকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এ খাতের প্রতি জনগণের আস্থা অটুট রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আস্থা সংকট তৈরি হলে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জবাবে গভর্নর জানান, ব্যাংকিং রেজল্যুশন আইন অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতের সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে সম্মিলিত ব্যাংকগুলোর জন্য দ্রুত চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়েও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, বর্তমানে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ সন্তোষজনক থাকলেও ভবিষ্যতে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের কারণে ডলারের চাহিদা বাড়তে পারে। এতে আমদানিও বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি রেমিট্যান্স প্রবাহ সবসময় একই মাত্রায় থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই বৈদেশিক মুদ্রাবাজার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ও সতর্ক নীতি গ্রহণের প্রয়োজন রয়েছে।

