আসন্ন জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতসহ দেশীয় শিল্প বিকাশে বড় ধরনের কর ছাড় ও নীতি সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক যান এবং ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে একগুচ্ছ প্রণোদনা ঘোষণা করা হতে পারে।
জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা ও ক্রমাগত দাম বৃদ্ধির চাপ কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। একই সঙ্গে দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করতে বিদ্যমান কর সুবিধার মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
বর্তমানে দেশীয়ভাবে কম্পিউটার ও ল্যাপটপ উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা রয়েছে, যা আগামী বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী এই সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। একইভাবে ব্লেন্ডার ও জুসারের মতো গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান শুল্ক ছাড়ের মেয়াদও ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর চিন্তাভাবনা চলছে।
অন্যদিকে বৈদ্যুতিক যান আমদানিতে বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশ করভার রয়েছে, যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি দেশীয়ভাবে বৈদ্যুতিক যান উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর ও আয়করে ছাড় দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বর্তমানে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানিতে ৩৬ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত কর দিতে হয়। নতুন বাজেটে এই হার কমিয়ে প্রায় ১৫ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে কর অবকাশ সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ থেকে বাড়িয়ে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত করা হতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিনিয়োগ করা হলে প্রথম পাঁচ বছর কোনো কর দিতে হবে না। এরপর তিন বছর ৫০ শতাংশ ছাড় এবং পরবর্তী দুই বছর ২৫ শতাংশ কর ছাড় পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আয়কর বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়তা করতেই আগামী বাজেটে কর কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরকারের অগ্রাধিকার খাত। তাই এই খাতে আমদানি কর, মূল্য সংযোজন কর ও আয়করে সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
সৌরবিদ্যুৎ খাতে ইতিমধ্যে যারা বিনিয়োগ করেছেন, তারা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় টেক্সটাইল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, বর্তমানে সোলার যন্ত্রাংশে উচ্চ করের কারণে স্থাপন ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। কর কমানো হলে বিনিয়োগ আরও বাড়বে।
তিনি জানান, বর্তমানে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে খরচ কয়েক কোটি টাকার বেশি। কর কমলে প্রতি মেগাওয়াটে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। তবে আন্তর্জাতিক তুলনায় এখনো খরচ বেশি রয়ে গেছে। বর্তমানে শিল্প খাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চলতি বছরের শেষে এই সক্ষমতা দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।
সৌরশিল্প সংশ্লিষ্ট সংগঠনের একজন শীর্ষ প্রতিনিধি বলেন, স্থানীয় উৎপাদকদের সক্ষমতা থাকলেও যথাযথ সুরক্ষা না থাকলে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার মতে, ইতিমধ্যে প্রতিযোগিতার চাপে অনেক প্রতিষ্ঠান টিকে থাকতে পারেনি।
অন্যদিকে দেশীয় হোম অ্যাপ্লায়েন্স ও কম্পিউটার শিল্প বিকাশেও কর সুবিধা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ল্যাপটপ ও কম্পিউটার উৎপাদনে ভ্যাট অব্যাহতির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি তৈরিতে ব্যবহৃত কাঁচামালে শুল্ক ছাড়ের মেয়াদও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশের একটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধি জানান, নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে আমদানি নির্ভরতা কমবে এবং দেশীয় উৎপাদন শক্তিশালী হবে। কর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থানীয় শিল্পকে আরও সময় দেওয়া হলে তা ইতিবাচক ফল দিতে পারে। তবে এসব সুবিধার বাস্তব ফলাফল যেমন আমদানি নির্ভরতা কমছে কি না এবং ভোক্তা কতটা উপকৃত হচ্ছে, তা নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি।

