দেশের তরুণদের মাদক, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ থেকে দূরে রাখতে এবার সৃজনশীল অর্থনীতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এই লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সৃজনশীল অর্থনীতির সম্ভাবনা, পরিধি ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরবেন বলে জানা গেছে। সাধারণভাবে সৃজনশীল অর্থনীতি বলতে চলচ্চিত্র, সংগীত, নাটক, নৃত্য, প্রকাশনা, বিজ্ঞাপন, স্থাপত্য, শিল্পকলা, কারুশিল্প, নকশা, সফটওয়্যার এবং ভিডিও গেমসসহ নানা সৃজনশীল খাতকে বোঝানো হয়।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৃজনশীল অর্থনীতি এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সৃজনশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ব্যবহার করে পণ্য ও সেবা তৈরি, উৎপাদন ও বাজারজাত করা হয়।
সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে এই খাতকে শক্তিশালী করা। অর্থ মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে একদিকে যেমন দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশ ঘটবে, অন্যদিকে উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি ও রপ্তানি আয় বাড়বে। পাশাপাশি সৃজনশীল অর্থনীতিকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা এবং দেশের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংও এর লক্ষ্য। বিশ্বের অনেক উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশে এই খাত কর্মসংস্থান ও মোট দেশজ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
গত ২১ মে প্রথম আলো আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশের ‘সফট পাওয়ার’ দুর্বল। অথচ পাশের দেশগুলো চলচ্চিত্র ও সংগীতের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তার করছে।
সৃজনশীল অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশল উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকারের লক্ষ্য তরুণদের সৃজনশীল কাজে যুক্ত করা। এতে একদিকে তারা মাদক ও উগ্রবাদ থেকে দূরে থাকবে, অন্যদিকে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তিনি আরও বলেন, এতদিন এই খাতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা সীমিত ছিল। এখন সরকার এটিকে অর্থনৈতিক খাত হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, যাতে বহুমুখী লাভ পাওয়া যায়।
নির্বাচনী ইশতেহারে সৃজনশীল অর্থনীতি বিষয়ে নির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল বিএনপি। সেখানে বলা হয়, এই খাত থেকে মোট দেশজ উৎপাদনে অন্তত এক দশমিক পাঁচ শতাংশ অবদান এবং পাঁচ লাখ কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য রয়েছে। ইশতেহারে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশ সৃজনশীল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ গঠন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ‘ক্রিয়েটেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে একাধিক বৈঠক করেছে। প্রথম বৈঠক হয় ১১ মে, যেখানে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব হাসান খালেদ ফয়সাল একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন। সেখানে বলা হয়, এই খাতের অর্থনৈতিক অবদান নিয়ে দেশে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি রয়েছে।
দ্বিতীয় বৈঠক হয় ২৩ মে। সেখানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয় এবং অর্থমন্ত্রীকে প্রধান করে একটি জাতীয় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। পাশাপাশি অর্থ বিভাগের অধীনে সমন্বয় কমিটিও গঠিত হবে।
প্রস্তাব ও পরিকল্পনা:
বৈঠকে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের লিটু ঢাকার পূর্বাচলে একশ একর জমিতে সৃজনশীল বিনোদন কেন্দ্র গড়ার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে প্রতিটি উপজেলায় সৃজনশীল কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাবও উঠে আসে।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ চলচ্চিত্র, কারুশিল্প ও সাংস্কৃতিক পর্যটনকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন। তিনি সহজ শর্তে ঋণ ও ভর্তুকির মাধ্যমে চলচ্চিত্র শিল্পকে সহায়তার প্রস্তাব দেন। সংস্কৃতিবিষয়ক সচিব কানিজ মওলা হারিয়ে যেতে বসা যাত্রা ও সার্কাস পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ চান। জয়িতা ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ এবং মৌসুমি মেলার আয়োজনের কথা বলেন।
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকার পূর্বাচলে একশ একর জমিতে একটি সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। এ বিষয়ে প্রস্তাব তৈরি করবে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিল্পকলা একাডেমির আওতায় সৃজনশীল কেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ বিষয়ে যৌথ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও ব্র্যাক। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পর্যায়ে উদ্ভাবন কেন্দ্র স্থাপন করা হবে। এর পরিকল্পনা তৈরি করবে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ।
বিসিক খালি জমি চিহ্নিত করে সেখানে প্রশিক্ষণ ও সৃজনশীল কার্যক্রম কেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেবে। একই সঙ্গে ‘একটি গ্রাম, একটি পণ্য’ উদ্যোগে স্থানীয় হস্তশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে আন্তর্জাতিক বাজারে নিয়ে যাওয়ার কাজও করবে সংস্থাটি। পর্যটন খাত উন্নয়নে একটি মহাপরিকল্পনা নেওয়া হবে। কক্সবাজারে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে। পাশাপাশি জাতীয় উৎসব ক্যালেন্ডার তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
অর্থ বিভাগ সৃজনশীল অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে লোকসংস্কৃতি, হস্তশিল্প, শিল্পকলা, মিডিয়া ও বিনোদন, প্রকাশনা, নকশা, তথ্যপ্রযুক্তি, পর্যটন এবং ফ্যাশন শিল্প। এই খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে লোকসংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র, টেলিভিশন, অনলাইন কনটেন্ট, ডিজিটাল প্রকাশনা, গ্রাফিক নকশা, অ্যাপ উন্নয়ন, পর্যটন সেবা, ঐতিহ্যভিত্তিক পণ্য এবং ফ্যাশন ডিজাইন।
বিশ্বে সৃজনশীল অর্থনীতি থেকে বছরে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়। কর্মসংস্থান হয় প্রায় পাঁচ কোটি মানুষের। সফটওয়্যারভিত্তিক সেবা এই খাতের বড় অংশ। অনেক দেশ এই খাত থেকে তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের বড় অংশ অর্জন করছে। তবে বাংলাদেশে এ খাতের অবদান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারিত হয়নি। সরকারের লক্ষ্য, আগামীতে এই খাতকে মোট দেশজ উৎপাদনের অন্তত এক দশমিক পাঁচ শতাংশে উন্নীত করা।
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়:
অর্থ বিভাগের মতে, এই খাতে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মেধাস্বত্ব সুরক্ষার দুর্বলতা, তথ্যের অভাব, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং বিনিয়োগ সংকট। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সহজে ঋণ পান না। ভেঞ্চার মূলধন ও বিশেষ তহবিলও সীমিত। দক্ষ জনবল, আধুনিক স্টুডিও ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অভাবও রয়েছে। সরকারের মতে, এই খাতে বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয় করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা এবং জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, সমাজে বিভিন্ন অপশক্তির প্রভাব কমাতে সৃজনশীল খাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চলচ্চিত্র, কারুশিল্প ও সাংস্কৃতিক পর্যটন এই খাতের প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে।

