বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বেশি বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ‘ক্ষমতা ভাড়া’। উৎপাদন না করেও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের এই অর্থ পরিশোধকে ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র সমালোচনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিদ্যুৎ ও সামগ্রিক অর্থনীতির বড় চাপের উৎস হয়ে উঠেছে এই অস্বাভাবিক ব্যয় ব্যবস্থা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই খরচ আরও দ্রুত বেড়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে ২০১১-১২ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত শুধু ক্ষমতা ভাড়ায় ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা, যা এক বছরে প্রায় ২৪ শতাংশ বৃদ্ধি। সব মিলিয়ে গত ১৫ বছরে রাষ্ট্রীয় খরচ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকারও বেশি। চলতি অর্থবছরে এ ব্যয় আরও বেড়ে ৪৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। আগামী অর্থবছরে তা ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায় ওঠার আশঙ্কাও করা হচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত একটি পর্যালোচনা কমিটি, যার নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, বিদ্যুৎ খাতের এসব চুক্তি বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ এই ক্ষমতা ভাড়া। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণ সাধারণত ১২ বছরের মধ্যে শোধ হয়ে গেলেও চুক্তির কারণে ১৩ থেকে ২২ বছর পর্যন্ত উচ্চ হারে এই ভাড়া দিতে হচ্ছে, যা সরকারের ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুও জানিয়েছেন, এই ব্যয় সরকারের জন্য বড় চাপ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি। দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, আর গড় উৎপাদন থাকে ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে।
এই হিসাবে দেখা যায়, প্রকৃত উৎপাদনের তুলনায় বড় অংশের কেন্দ্র অলস পড়ে থাকে। যদিও এক দিনের সর্বোচ্চ উৎপাদনকে ভিত্তি ধরলে সক্ষমতার অতিরিক্ত অংশ দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, চাহিদার ২০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত সক্ষমতা রাখা যৌক্তিক, যা অনুযায়ী ১৯ থেকে ২০ হাজার মেগাওয়াটই যথেষ্ট বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, ২০ শতাংশের আশপাশে রিজার্ভ মার্জিন থাকলে তা ভারসাম্যপূর্ণ হয়। এর বেশি হলে ক্ষমতা ভাড়া বেড়ে যায়, আর কম হলে লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়।
বছরভিত্তিক ব্যয়ের চিত্র:
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের টেকনিক্যাল ইভ্যালুয়েশন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০১১-১২ অর্থবছরে এ খাতে ব্যয় ছিল ৫ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা। এরপর ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৬ হাজার ২৭ কোটি, ২০১৩-১৪ সালে ৫ হাজার ৭৭৪ কোটি, ২০১৪-১৫ সালে ৫ হাজার ৭৪৭ কোটি এবং ২০১৫-১৬ সালে ৬ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা ব্যয় হয়।
২০১৬-১৭ সালে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ৭ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা। পরের বছর ৯ হাজার ২৪০ কোটি এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ১২ হাজার ৪১০ কোটি টাকায় পৌঁছে যায়। ২০১৯-২০ সালে ব্যয় ছিল ১৫ হাজার ১১৪ কোটি, ২০২০-২১ সালে ১৭ হাজার ২৩৮ কোটি এবং ২০২১-২২ সালে ১৫ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ব্যয়ে বড় উল্লম্ফন দেখা যায়। ওই বছরে ব্যয় হয় ২৪ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এটি ৪৫ হাজার ৪৫১ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
সব মিলিয়ে ১৪ অর্থবছরে এ খাতে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১৩ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এটি ৪৮ হাজার ২৬০ কোটি এবং পরের অর্থবছরে ৫২ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সরকার ইতোমধ্যে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সমন্বয় করেছে বলে জানা গেছে। বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থার চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, উৎপাদন ব্যয়ের একটি বড় অংশ এই ক্ষমতা ভাড়ার কারণে বাড়ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ভোক্তারা এখন শুধু ব্যবহৃত বিদ্যুতের খরচ নয়, বরং অব্যবহৃত সক্ষমতার মূল্যও বহন করছেন। ফলে ভর্তুকির চাপ আগামী বছরগুলোতেও উচ্চ পর্যায়ে থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, গত দেড় দশকে বিশেষ সুবিধা নিয়ে বিদ্যুৎ খাতে কয়েকটি কোম্পানি বিপুল মুনাফা করেছে। বিশেষ আইনের মাধ্যমে দরপত্র ছাড়াই চুক্তি, মেয়াদ বৃদ্ধি এবং সমঝোতার ভিত্তিতে প্রকল্প অনুমোদনের কারণে এসব সুবিধা পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এগ্রিকো ইন্টারন্যাশনালের ঘোড়াশাল ১৪৫ মেগাওয়াট কেন্দ্রটি একটি উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে। ২০১০ সালে চালু হওয়া এই কেন্দ্রের বিনিয়োগ ছিল ৫৬০ কোটি টাকা। তিন বছরের প্রকল্পটি কয়েক দফা বাড়িয়ে ২০১৮ সাল পর্যন্ত চালু রাখা হয়। এই সময়ে শুধু ক্ষমতা ভাড়া বাবদ তারা পেয়েছে ২ হাজার ৫০২ কোটি টাকা, যা মূল বিনিয়োগের সাড়ে চার গুণের বেশি।
অন্তর্বর্তী সরকারের শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদনে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার অনিয়ম হয়েছে। বিনা দরপত্রে চুক্তি ও উচ্চ ক্ষমতা ভাড়ার সুযোগ তৈরি করায় এ খাতে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব, শীর্ষ আমলারা এবং তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবসায়ীরা সুবিধাজনক শর্ত পেয়েছেন। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এ ধরনের চুক্তি সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করা হয়।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ১৫ বছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ক্ষমতা ভাড়া বাবদ ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা যত বেড়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে এই ব্যয়। অথচ অধিকাংশ কেন্দ্রের সক্ষমতার অর্ধেকও ব্যবহার হয়নি। কিছু কেন্দ্র বছরে মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ উৎপাদন করেছে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কেন্দ্রগুলোর ৮০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহারের ভিত্তিতে ভাড়া নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তার বড় অংশই অচল পড়ে রয়েছে।

