বর্ষা শুরু হওয়ায় ২০২৫–২৬ চাষ মৌসুমের সমাপ্তির সঙ্গে মাঠ ছেড়ে চলে গেছেন দেশের লবণচাষীরা। নভেম্বর থেকে মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত টানা ১৯৪ দিন অনিয়মিতভাবে চলা এই মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়েছে।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, এবারের মৌসুমে প্রায় সাড়ে ১৯ লাখ টন লবণ উৎপাদন হয়েছে। নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৭ লাখ ১৫ হাজার টন। ফলে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার টনে।
চলতি মৌসুম শুরু হয় ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর কুতুবদিয়ায় প্রথম লবণ উৎপাদনের মধ্য দিয়ে। তবে শুরু থেকেই আবহাওয়া ছিল প্রতিকূল। ঘন কুয়াশা ও অনিয়মিত পরিস্থিতির কারণে মোট ৩৬ দিন মাঠে নামতে পারেননি চাষীরা। এর প্রভাব পড়ে সামগ্রিক উৎপাদনে।
এ মৌসুমে ৪০ হাজার ১৫০ জন চাষী ৬৭ হাজার ৭৫৭ একর জমিতে লবণ চাষ শুরু করেন। গড়ে একরপ্রতি উৎপাদন হয়েছে ২৮ দশমিক ৭০ টন। মে মাসের ২৪ ও ২৫ তারিখে কক্সবাজার অঞ্চলে বৃষ্টিপাত শুরু হলে চাষীরা উৎপাদন বন্ধ করে দেন। ওই সময়ে উৎপাদিত লবণ প্রচলিত পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামসহ তারা মাঠ ছেড়ে চলে যান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২৪ মে কক্সবাজার এলাকায় এলাকাভেদে ১০ থেকে ৩৯ মিলিমিটার এবং ২৫ মে ৭ থেকে ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। বৃষ্টির কারণে মাঠ নষ্ট হয়ে যায়। পাশাপাশি চিংড়ি চাষের জন্য জমি প্রস্তুতের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় চাষীরা বাঁধ কেটে জোয়ারের পানি লবণ মাঠে প্রবেশ করান।
কক্সবাজারের বিসিক লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর আলম ভূঁইয়া বলেন, “২৫ মে লবণ উৎপাদন মৌসুম শেষ হয়েছে। শুরুতে কুয়াশাজনিত বিরূপ আবহাওয়া ছিল। পরে আগাম বৃষ্টিপাতের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হয়। ২৪–২৫ মে বৃষ্টির পর মাঠ নষ্ট হয়ে গেলে চাষীরা উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হন।” তিনি আরও জানান, চিংড়ি চাষের প্রস্তুতির কারণে জমি ছেড়ে দেওয়ায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম হয়েছে।
অন্যদিকে জানা গেছে, গত বছরের শেষার্ধে দেশে লবণের চাহিদা থাকলেও উৎপাদন কম হওয়ায় সরকার প্রায় ১ লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি দেয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউ আবেদন না করায় কয়েক দফায় সময় বাড়ানো হয়। এরপরও ব্যবসায়ী ও মিল মালিকদের অনাগ্রহে আমদানির উদ্যোগে ভাটা পড়ে।
বর্তমানে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম থাকায় বাজারে লবণের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ঈদুল আজহার আগে মণপ্রতি দাম ৬০ থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, সরবরাহ ঘাটতি অব্যাহত থাকলে সামনে বাজার আরও অস্থির হতে পারে।
এদিকে ঈদুল আজহার সময় এতিমখানা, মাদ্রাসা ও মসজিদ কমিটিতে বিনামূল্যে লবণ বিতরণ করে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন। গত বছর ১৪ হাজার টন লবণ বিতরণ করা হলেও এ বছর দাম বৃদ্ধির কারণে তা কমে ১১ হাজার টনে নেমে আসে।
সংস্থাটির লবণ সেলের প্রধান সরোয়ার হোসেন জানান, কয়েক বছর ধরে চাহিদা অনুযায়ী লবণ উৎপাদন হলেও এবার তা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ২০২৪–২৫ মৌসুমে ৬৪ বছরের মধ্যে রেকর্ড উৎপাদন হয়েছিল। তবে এবার জমি ও চাষীর সংখ্যা বাড়লেও আবহাওয়াজনিত কারণে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। সরবরাহ–চাহিদার ভারসাম্য না থাকলে সরকার বাজার স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে বলেও জানান তিনি।

