চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষ হতে আর প্রায় এক মাস বাকি। কিন্তু এ সময়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ধীরগতি এবং নানা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিদেশি ঋণপ্রবাহ প্রত্যাশার তুলনায় কমে গেছে। গত জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি উভয়ই আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। একই সঙ্গে পুরোনো বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
ঘাটতি পূরণে ঋণ কৌশলে বড় পরিবর্তন:
অর্থ মন্ত্রণালয়ের খসড়া বাজেট পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি পূরণে বিদেশি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯১ শতাংশ বাড়িয়ে এক লাখ ১১ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা অনুদান পাওয়ারও প্রাক্কলন রয়েছে। অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরে সংশোধিত বাজেটে বিদেশি ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৮ হাজার কোটি টাকা এবং অনুদান পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
খসড়া পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, আগামী অর্থবছরে মোট বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় দুই লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা জাতীয় উৎপাদনের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরে ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ কোটি টাকা।
এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিদেশি উৎসের দিকে ঝুঁকছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ নিট ঋণ কমিয়ে এক লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকায় নামানোর লক্ষ্য রয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণ ১৫ শতাংশের বেশি কমিয়ে এক লাখ কোটি টাকায় নামানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশি ঋণ বাড়ানোর প্রধান উদ্দেশ্য হলো ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমানো এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো। কারণ, সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে, যা এখন পর্যন্ত সর্বনিম্ন। এতে বিনিয়োগ কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিদেশি ঋণ ও অনুদানের বর্তমান চিত্র:
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থছাড় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৯৩ কোটি ডলার কমেছে। এই সময়ে অর্থছাড় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪২৩ কোটি ডলারে, যেখানে আগের বছর একই সময়ে ছিল ৫১৬ কোটি ডলারের বেশি। ঋণ হিসেবে এসেছে প্রায় ৩৮৫ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৪৮১ কোটি ডলার।
একই সময়ে বিদেশি ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতিও ৩৪ শতাংশ কমেছে। জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে মোট প্রতিশ্রুতি এসেছে প্রায় ২৮১ কোটি ডলার, যেখানে আগের বছর ছিল প্রায় ৪২৬ কোটি ডলার। এর মধ্যে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে ২৬৫ কোটি ডলার, যা আগের বছরের ৩৯০ কোটি ডলারের তুলনায় অনেক কম।
অন্যদিকে, পুরোনো বিদেশি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের চাপও বেড়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই–এপ্রিল সময়ে বাংলাদেশ প্রায় ৩৮০ কোটি ডলার পরিশোধ করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে ৮ শতাংশ বেশি।
বিদেশি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। তাদের মতে, এক বছরে এক লাখ কোটি টাকার বেশি বিদেশি ঋণ সংগ্রহ করা বাস্তবে কঠিন হতে পারে। পাশাপাশি পাইপলাইনে থাকা প্রকল্পগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হলে কাঙ্ক্ষিত অর্থছাড় পাওয়া যাবে না।
তাদের আশঙ্কা, ঋণনির্ভরতা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে সুদ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে ৫৭ শতাংশ অভ্যন্তরীণ এবং ৪৩ শতাংশ বিদেশি ঋণ।

