কলকারখানার নিরবচ্ছিন্ন উৎপাদন আর বাজারের ব্যস্ততা—সবকিছুর আড়ালে এখন বড় এক অনিশ্চয়তা ঘুরপাক খাচ্ছে। সামনে আসছে ২০২৬–২০২৭ অর্থবছরের বাজেট। সেই বাজেটে করের চাপ বাড়বে কি না, নতুন কর বসবে কি না—এ নিয়েই সবচেয়ে বেশি আলোচনা ব্যবসায়ী মহলে।
একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার অস্থির, অন্যদিকে দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ ক্রমেই বাড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক মন্দাভাব। এমন বাস্তবতায় আসন্ন বাজেটকে ঘিরে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে।
সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী বাজেটের আকার ধরা হতে পারে প্রায় ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা বেশি। ব্যয় মেটাতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি।
রাজস্ব আদায়ের প্রধান দায়িত্ব থাকবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওপরই। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৫ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা হলেও বাস্তবে ৫ লাখ কোটি টাকার বেশি আদায় হওয়া কঠিন হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই মনে করছে, ২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতিকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যে নিতে হলে প্রয়োজন একটি ব্যবসাবান্ধব ও হয়রানিমুক্ত বাজেট কাঠামো। তাদের মতে, করদাতাদের হয়রানি বন্ধ না হলে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করছেন, যারা নিয়মিত কর দেন, মূলত তারাই বারবার চাপের মুখে পড়েন। অথচ বহু উচ্চ আয়ের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এখনো করের আওতার বাইরে। তাই করহার না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণের দাবি জোরালো হচ্ছে। তাদের আরও দাবি, করনীতি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও পূর্বানুমানযোগ্য, যাতে ব্যবসায়ীরা আগেই পরিকল্পনা করতে পারেন। পাশাপাশি কর প্রশাসনকে আধুনিকায়ন ও স্বয়ংক্রিয় করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
এফবিসিসিআই প্রস্তাব দিয়েছে, তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির করপোরেট করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হোক। পর্যায়ক্রমে এটি ২০ থেকে ২২ শতাংশে নামিয়ে আনার সুপারিশও রয়েছে। রপ্তানি খাতে উৎসে কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ করার এবং আগামী পাঁচ বছর তা বহাল রাখার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম আয়কর ও উৎসে কর যৌক্তিক করার দাবি জানানো হয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট ব্যবস্থায় বিশেষ ছাড় চেয়েছে ব্যবসায়ী সংগঠনটি। স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ শতাংশ করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আমদানিতে অগ্রিম কর ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি রয়েছে, কারণ এটি উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় বলে ব্যবসায়ীদের মত। শুল্ক ব্যবস্থায় প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত হয় না এমন শিল্প যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ শুল্ক এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত যন্ত্রপাতিতে ৩ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা যেতে পারে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্প টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল দামে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। রপ্তানিমুখী শিল্পে পরিবহন ও লজিস্টিক খরচ কমানো জরুরি। এছাড়া জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিবর্তে বিকল্প প্রণোদনার প্রস্তাব এসেছে। বিদ্যুৎ, এলপিজি ও জ্বালানি তেল খাতে বেসরকারি অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি উঠেছে। রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল বাড়ানো এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানে বৈদেশিক মিশনগুলোকে আরও সক্রিয় করার আহ্বানও জানানো হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। ব্যাংক ঋণের সুদের হার কমানো এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পুঁজিবাজারে আস্থা ফেরাতে নীতি সহায়তার পাশাপাশি নগদবিহীন অর্থনীতি গড়তে একটি সমন্বিত পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব এসেছে।
দেশে লজিস্টিক খরচ বর্তমানে প্রায় ১৬ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় ১০ শতাংশ। এই পার্থক্য কমানো গেলে রপ্তানি প্রতিযোগিতা বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বন্দর সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় কমানো এবং সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানোর দাবিও উঠেছে।
ব্যবসায়ীরা টার্নওভার কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছেন। পর্যায়ক্রমে এটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাবও রয়েছে। অগ্রিম আয়কর ও অগ্রিম কর ধাপে ধাপে কমানোর মাধ্যমে কার্যকর মূলধনের চাপ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রশাসনিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতা কমানো না গেলে বিনিয়োগ বাড়বে না। কর ও ব্যবসা সংক্রান্ত সেবা আরও সহজ ও হয়রানিমুক্ত করার দাবি তাদের দীর্ঘদিনের। নিয়মিত অনলাইন সেবা, একক সেবা কেন্দ্র এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এক অনুষ্ঠানে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী আহসান খান চৌধুরী বলেন, কর না বাড়ালে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং অর্থনীতি আরও বড় হবে। মেঘনা গ্রুপের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা ও নেতিবাচক মনোভাব এখনও বড় বাধা হয়ে আছে। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এহতেশামুল হক খান বলেন, বৈশ্বিক অস্থিরতা দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলছে, তাই ব্যবসাবান্ধব নীতি জরুরি।
সব মিলিয়ে আসন্ন বাজেটকে ঘিরে ব্যবসায়ী মহলে একদিকে রয়েছে সতর্কতা, অন্যদিকে প্রত্যাশা। কর না বাড়িয়ে বরং কর ব্যবস্থার সংস্কার, হয়রানি কমানো এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি—এই দাবিগুলোই এখন সবচেয়ে জোরালো।

