বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সুপারিশ করেছে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের বর্তমান বাস্তবতায় এ সুপারিশকে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি হিসেবে দেখছেন।
বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা পাওয়ার কথা। তবে গত কয়েক বছরে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জের কারণে উত্তরণের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এলডিসি উত্তরণের প্রক্রিয়াকে দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হয়েছিল কিন্তু রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যবসায়ী ও বেসরকারি খাতের বিভিন্ন অংশীজন উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতার জন্য দেশ এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। তাদের মতে, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া উত্তরণ হলে অর্থনীতি নতুন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল ও ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রবিষয়ক দপ্তরকে বাংলাদেশের প্রস্তুতি মূল্যায়নের দায়িত্ব দেয়। সংস্থাটি অল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন সম্পন্ন করে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে জমা দেওয়া ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রস্তুতিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি এবং বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের চিত্র উঠে আসে। সেখানে বলা হয়, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগের গতি কমেছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দারিদ্র্য কমানোর দীর্ঘদিনের অর্জন আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ব্যাংকিং খাত গভীর সংকটে রয়েছে। পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, রাজস্বসংক্রান্ত দুর্বলতা এবং অন্যান্য কাঠামোগত সমস্যার কথাও উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করায় এসব উদ্বেগ আরও জোরালো হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকারও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তরণের সময় বাড়ানোর আবেদন জানায়।
মূল্যায়ন প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল উত্তরণের যোগ্যতা এবং উত্তরণের প্রস্তুতির মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট করা। অর্থাৎ কোনো দেশ প্রয়োজনীয় সূচক পূরণ করে এলডিসি থেকে বের হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে কিনা, সেটি এক বিষয়। আর উত্তরণের পর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অভিঘাত সামলে টেকসই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার সক্ষমতা রয়েছে কিনা, সেটি ভিন্ন বিষয়।
প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়, জাতিসংঘের লক্ষ্য শুধু কোনো দেশকে এলডিসি থেকে বের করে আনা নয়; বরং উত্তরণের পর তার উন্নয়ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা। সিডিপির পর্যবেক্ষণও একই ধরনের হওয়ায় বাংলাদেশের সময় বাড়ানোর আবেদন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
সিডিপির মূল্যায়নে দুটি বিষয় বিশেষভাবে উঠে এসেছে। প্রথমত, বাংলাদেশ এখনো এলডিসি উত্তরণের জন্য নির্ধারিত সব সূচকে প্রয়োজনীয় সীমারেখার অনেক ওপরে রয়েছে। অর্থাৎ উত্তরণের যোগ্যতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দ্বিতীয়ত, কভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন, ভূরাজনৈতিক সংকট এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে প্রস্তুতিমূলক নানা পদক্ষেপ বাস্তবায়নে বিলম্ব হয়েছে। ফলে অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজনীয়তা আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
তবে সিডিপির সুপারিশই শেষ কথা নয়। এখন প্রয়োজন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সমর্থন। এজন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরতে হবে যে বাংলাদেশ উত্তরণ এড়াতে চায় না; বরং উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে চায়। উন্নয়ন সহযোগী, বাণিজ্যিক অংশীদার এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক জোটগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সময় বাড়ানোর বিষয়টি কোনো রাজনৈতিক বা কৌশলগত দরকষাকষির হাতিয়ার হওয়া উচিত নয়। বরং এটিকে উন্নয়ন-সংক্রান্ত বাস্তব প্রয়োজন হিসেবে উপস্থাপন করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। তবে বাড়তি সময় পাওয়া মানেই নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নয়। তিন বছর দীর্ঘ মনে হলেও বাস্তবে তা খুব দ্রুত শেষ হয়ে যেতে পারে। তাই এখন থেকেই অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজার। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই এ অঞ্চলে যায়। বর্তমানে এলডিসি সুবিধার কারণে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে। উত্তরণের পর এ সুবিধা আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে থাকবে না।
যদিও জিএসপি প্লাস ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু সুবিধা ধরে রাখার সম্ভাবনা রয়েছে, বাস্তবে বিষয়টি সহজ নয়। বাংলাদেশের পোশাক খাত ইতোমধ্যে ইউরোপীয় বাজারে বড় অংশীদার হয়ে উঠেছে। একই সময়ে ভিয়েতনামের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি কার্যকর হয়েছে এবং ভারতের সঙ্গেও অনুরূপ চুক্তির অগ্রগতি চলছে। ফলে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে।
রপ্তানি বহুমুখীকরণের আলোচনা দীর্ঘদিনের হলেও বাস্তব অগ্রগতি সীমিত। দেশের অনেক শিল্প স্থানীয় বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের উপস্থিতি এখনও দুর্বল। শুধু উৎপাদন বাড়ালেই রপ্তানি বৃদ্ধি পায় না। এর জন্য প্রয়োজন বৈশ্বিক ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক, আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ, মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্রযুক্তি, নকশা উন্নয়ন, ব্র্যান্ডিং এবং কার্যকর বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা।
এ ক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যেসব দেশ দ্রুত রপ্তানি বহুমুখীকরণে সফল হয়েছে, তারা কেবল স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ওপর নির্ভর করেনি। বিদেশি বিনিয়োগকারী ও যৌথ উদ্যোগের মাধ্যমে নিজেদের শিল্পকে বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকে দ্রুত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো পুরোপুরি প্রস্তুত করতে হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজন হলে বড় বহুজাতিক রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আকৃষ্ট করতে সুপরিকল্পিত প্রণোদনাও দেওয়া যেতে পারে।
বর্তমানে বিশ্বের অনেক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এক বা দুটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র খুঁজছে। দক্ষ শ্রমশক্তি, বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা, দীর্ঘ রপ্তানি অভিজ্ঞতা এবং আঞ্চলিক সরবরাহ ব্যবস্থার কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।
তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বহু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার এখনো বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকলেও রপ্তানি সহায়তা কমানোর পদক্ষেপ তুলনামূলক দ্রুত নেওয়া হয়েছে। অথচ সাম্প্রতিক বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দেখায়, লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি সহায়তা অনেক ক্ষেত্রেই রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
সবশেষে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাড়তি সময়ের সাফল্য নির্ভর করবে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার ওপর। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা দূর করা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না।
সরকার নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরির কাজ করছে। এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকে এ পরিকল্পনার কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত করতে হবে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে পরিকল্পনা ও কৌশল প্রণয়নে দক্ষতার পরিচয় দিলেও বাস্তবায়নে দুর্বলতা বারবার সামনে এসেছে। তাই সফল এলডিসি উত্তরণের জন্য সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে শক্তিশালী বাস্তবায়ন সংস্কৃতি গড়ে তোলা। রাজনৈতিক অঙ্গীকার, কার্যকর সংস্কার এবং দ্রুত বাস্তবায়নের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই অতিরিক্ত সময় দেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
- সূত্র: ড. আব্দুর রাজ্জাক, অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, র্যাপিড।

