বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রার রূপরেখাও নির্ধারণ করে। সরকারের নীতি, অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতিফলন ঘটে এই গুরুত্বপূর্ণ দলিলে। আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি তাদের প্রথম বাজেট হওয়ায় জনমনে প্রত্যাশাও অনেক বেশি।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি গণতান্ত্রিক সরকারের অধীনে বাজেট প্রণয়ন হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী মহলের নজর এখন আসন্ন বাজেটের দিকে। প্রত্যাশা রয়েছে, জনগণের চাহিদা ও বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিয়েই নতুন বাজেট তৈরি হবে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এবারের বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় হতে পারে। সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। নিঃসন্দেহে এটি একটি উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, বড় আকারের বাজেট ঘোষণা করা হলেও সেগুলোর পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রায়ই সম্ভব হয়নি। বরাদ্দের পরিমাণ বাড়লেও বাস্তবায়নের ঘাটতি থেকে গেছে। তবে অন্তর্বর্তী সরকার আগের ধারা থেকে সরে এসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটকে তার আগের বছরের তুলনায় ছোট করেছিল।
এবারের বাজেট আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ব্যক্তিশ্রেণির আয়কর। কারণ গত কয়েক বছরে মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। গত তিন বছরে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতি হয়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে মানুষের আয় বাড়েনি। ফলে ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ। এর আগে ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসেই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করেছে। অন্যদিকে এপ্রিল মাসে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির তুলনায় মজুরি বৃদ্ধির হার কম থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও সামাজিক সংগঠন করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় এ দাবিকে যৌক্তিক বলেই মনে করা হচ্ছে। আলোচনায় শোনা যাচ্ছে, বর্তমানে সর্বনিম্ন ৫ শতাংশ করহারের পরিবর্তে ১০ শতাংশ করহার চালুর চিন্তা করা হচ্ছে। পাশাপাশি করমুক্ত আয়সীমা সামান্য বাড়ানো হতে পারে। গত বছরের বাজেটে এ সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় উন্নীত করার কথা বলা হয়েছিল।
তবে সর্বনিম্ন করহার ৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে উন্নীত হলে করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো ব্যক্তির বার্ষিক আয় যদি ৪ লাখ ৭৫ হাজার টাকা হয় এবং করমুক্ত সীমার ওপরে ১ লাখ টাকা আয় করযোগ্য হয়, তাহলে ১০ শতাংশ হারে তাকে ১০ হাজার টাকা কর দিতে হবে। অথচ ৫ শতাংশ হার বহাল থাকলে করের পরিমাণ হতো ৫ হাজার টাকা। ফলে করদাতার অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা ব্যয় হবে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এমন সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে অযৌক্তিক বলে বিবেচিত হতে পারে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, করমুক্ত আয়সীমার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। পাকিস্তান ও নেপালে করমুক্ত আয়ের সীমা তাদের নিজস্ব মুদ্রায় ৬ লাখ, ভারতে ১২ লাখ এবং শ্রীলঙ্কায় ১৮ লাখ। এ প্রেক্ষাপটে দেশের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এবং আঞ্চলিক বাস্তবতা বিবেচনায় করমুক্ত আয়সীমা অন্তত ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।
একই সঙ্গে করহার কাঠামোতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ৫ লাখ টাকার পরবর্তী ৫ লাখ টাকার ওপর ৫ শতাংশ, তার পরের ৫ লাখ টাকার ওপর ৭ দশমিক ৫ শতাংশ, পরবর্তী ৬ লাখ টাকার ওপর ১০ শতাংশ, এরপরের ৩ লাখ টাকার ওপর ১৫ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ করহার ২০ শতাংশ নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
বর্তমানে দেশে কর শনাক্তকরণ নম্বরধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ। কিন্তু নিয়মিত আয়কর রিটার্ন জমা দেন মাত্র ৪২ থেকে ৪৬ লাখ মানুষ। এই বিশাল ব্যবধান কমাতে করদাতাদের জন্য নতুন প্রণোদনা চালুর প্রস্তাবও সামনে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত করদাতাদের জন্য পেনশন সুবিধা চালু করা হলে কর প্রদানে মানুষের আগ্রহ বাড়তে পারে। বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীরা পেনশন সুবিধা পেলেও বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য এমন কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই করদাতাদের প্রদত্ত করের ১০ শতাংশ অবসরের সময় পেনশন হিসেবে ফেরত দেওয়ার একটি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
অনেকের বিশ্বাস, এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মানুষ কর প্রদানে আরও উৎসাহিত হবে। কারণ বর্তমানে অনেক করদাতার ধারণা, তারা শুধু কর দিচ্ছেন কিন্তু এর বিনিময়ে সরাসরি কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না। বিপরীতে, কর প্রদানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার সম্পর্ক তৈরি হলে কর ফাঁকির প্রবণতাও কমতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের রাজস্ব আদায়ও বাড়বে।
আসন্ন বাজেটে করদাতাবান্ধব নীতি, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি এবং পেনশনভিত্তিক প্রণোদনার মতো বিষয়গুলো কতটা গুরুত্ব পায়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে দেশের করদাতা ও অর্থনৈতিক মহল।
- সূত্র: আনোয়ার ফারুক তালুকদার, ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

