দেশে মাথাপিছু ভূমির স্বল্পতা এবং জ্বালানি সীমাবদ্ধতা—এই দুই বড় সংকটকে উত্তরাধিকারসূত্রে বহন করতে হচ্ছে। অতিজনবহুল এই দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং সামগ্রিক উন্নয়ন টিকিয়ে রাখতে ভূমি ও জ্বালানি—দুই ক্ষেত্রই এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
দেশের প্রধান দেশীয় জ্বালানির উৎস হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। এখন পর্যন্ত দেশে ২৯টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব ক্ষেত্রের মোট মজুত প্রায় ৪০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে উত্তোলনযোগ্য মজুত ধরা হয় প্রায় ২৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। তবে এই মজুতের বিপরীতে চাহিদা অনেক বেশি।
ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকার আবাসিক ব্যবহার, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং রাসায়নিক সার—বিশেষ করে ইউরিয়া ও অ্যামোনিয়াম সালফেট উৎপাদনে ইতোমধ্যে প্রায় ২০ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার উৎপাদনের কারণে গ্যাসের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বর্তমানে দেশে বার্ষিক গ্যাসের চাহিদা এক ট্রিলিয়নের কিছু বেশি। এই পরিস্থিতিতে গ্যাস ব্যবহারে এক ধরনের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। একদিকে ইউরিয়া সার উৎপাদন করতে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, আবার বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ালে ইউরিয়া উৎপাদনে চাপ পড়ছে। ফলে দুই খাতের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে শিল্পায়ন সম্প্রসারণের জন্য নতুন গ্যাস সংযোগ এখন প্রায় অসম্ভব পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ দেওয়ার সুযোগও কার্যত নেই। এই অবস্থায় নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং আগে থেকে উৎপাদন কমে যাওয়া বা বন্ধ হয়ে যাওয়া গ্যাসক্ষেত্রের গভীরে আরও অনুসন্ধান চালানো ছাড়া বিকল্প পথ খুব সীমিত।
তবে একটি ইতিবাচক দিক হলো—দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের মান তুলনামূলকভাবে উচ্চ। এতে প্রায় ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশ মিথেন রয়েছে, যা গ্যাসের কার্যকারিতা ও উৎপাদনক্ষমতাকে অনেক বেশি কার্যকর করে তোলে।
উৎপাদনক্ষমতা যতই উন্নত হোক না কেন, বিদ্যমান গ্যাস মজুত দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অবশিষ্ট রয়েছে, যা দিয়ে বড়জোর আরও তিন থেকে পাঁচ বছর চাহিদা মেটানো যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে দেশের জনশক্তি এখন উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই বিশাল জনশক্তিকে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে শিল্পায়ন বাড়ানো প্রয়োজন। কিন্তু শিল্পায়নের এই গতি ধরে রাখতে জ্বালানি সরবরাহ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় ২০১৮ সাল থেকে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি শুরু হয়েছে। তবে এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ছে, যা অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে।
এই সংকটের মধ্যেই সম্ভাবনার আলো হিসেবে সামনে এসেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স—বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন লিমিটেড। ১৯৮৯ সালে পেট্রোবাংলার অধীনে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কারিগরি সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। ভূগর্ভস্থ খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, খনন কার্যক্রম এবং ব্যবস্থাপনায় বাপেক্স এখন অনেক বেশি দক্ষ ও স্বাবলম্বী।
দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটি এখন নিজস্ব সক্ষমতায় কাজ করছে। গ্যাস কূপ আবিষ্কারের ক্ষেত্রেও বাপেক্সের সফলতার হার বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ভালো বলে দেখা যায়। সাধারণভাবে পাঁচ থেকে ছয়টি কূপ খনন করলে যেখানে একটি গ্যাসক্ষেত্র শনাক্ত হয়, সেখানে বাপেক্স প্রায় তিনটি কূপে একটি সফল আবিষ্কার অর্জন করছে।
শাহবাজপুর, শ্রীকাইল, ভোলা উত্তর এবং ইলিশগড় গ্যাসক্ষেত্র—এই অর্জনগুলো বাপেক্সের প্রযুক্তিগত দক্ষতার বাস্তব প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি দেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র পরিচালনা করে বাণিজ্যিকভাবে গ্যাস উৎপাদনেও সফলতা দেখাচ্ছে। তবে সম্ভাবনার পরিসর এখনো অনেক বড়। দেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড এখনো পূর্ণাঙ্গ ভূতাত্ত্বিক জরিপের আওতায় আসেনি। এর পাশাপাশি রয়েছে বিশাল সমুদ্রাঞ্চল, যা সম্ভাবনাময় সম্পদের নতুন ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত।
২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার। এই বিশাল এলাকাকে কাজে লাগিয়ে নতুন গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এখন সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
যদিও বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাপেক্সে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এখনো পর্যাপ্ত নয়। ফলে গভীর স্থলভাগ এবং সমুদ্রতলদেশে অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক রিগ ও প্রযুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটি পিছিয়ে রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, তরলীকৃত গ্যাস আমদানির তুলনায় বাপেক্সে বিনিয়োগ প্রায় ১৪ গুণ বেশি সাশ্রয়ী হতে পারে। তবুও প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন মূলত গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের ওপর নির্ভরশীল থাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এই প্রেক্ষাপটে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা এখন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বঙ্গোপসাগরের নীল অর্থনীতি নিয়ে বিভিন্ন আলোচনায় জার্মান গবেষণা জাহাজ ‘আরভি সোনে’র অনুসন্ধান ও এর ফলাফল যথাযথভাবে সামনে আসেনি বলে মত রয়েছে। অথচ এই জাহাজের গবেষণা বঙ্গোপসাগরের সম্পদ সম্ভাবনা বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আশির দশকের শেষভাগ থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত ‘আরভি সোনে’ বঙ্গোপসাগরে একাধিক বৈজ্ঞানিক জরিপ পরিচালনা করে। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের এসও-৯৩ মিশনসহ পরবর্তী কার্যক্রমগুলো ছিল উল্লেখযোগ্য। এসব গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল সমুদ্রতলে উচ্চ চাপ ও নিম্ন তাপমাত্রায় জমাটবদ্ধ মিথেন গ্যাস হাইড্রেটের উপস্থিতি শনাক্ত করা, হিমালয় থেকে নেমে আসা পলিমাটি সঞ্চয়ের ফলে হাইড্রোকার্বন বা জ্বালানি উৎস তৈরি হচ্ছে কি না তা বিশ্লেষণ করা এবং টেকটোনিক প্লেটের গতিশীলতার কারণে ভূমিকম্প ও সুনামির ঝুঁকি মূল্যায়ন করা।
এই গবেষণায় বাপেক্স এবং বাংলাদেশ জিওলজিক্যাল সার্ভের প্রতিনিধিরাও অংশ নেয়। অভিজ্ঞতা অর্জনের অংশ হিসেবে তারা ‘আরভি সোনে’ জাহাজের তিন থেকে চারটি অভিযানে যুক্ত ছিলেন। সে সময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মুহ. ফজলুর রহমান মৌলিক ও প্রয়োগিক গবেষণার জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করেন। এই তহবিল থেকে জিওলজিক্যাল সার্ভের গবেষণা দলকেও অর্থায়ন দেওয়া হয়। বাংলাদেশি গবেষকদের উৎসাহ দিতে তিনি কক্সবাজারে ‘আরভি সোনে’ জাহাজ পরিদর্শন করেন।
হলোসিন যুগের সেডিমেন্টেশন নিয়ে পরিচালিত গবেষণাও এই সহযোগিতার অংশ ছিল। তবে পর্যাপ্ত তথ্য ও সক্ষমতার অভাবে ‘আরভি সোনে’ থেকে সংগৃহীত অনেক ডাটা তখন সম্পূর্ণভাবে বিশ্লেষণ বা ডিকোড করা সম্ভব হয়নি। তবুও বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, এই গবেষণায় বঙ্গোপসাগরের তলদেশে বিপুল পরিমাণ মিথেন গ্যাস হাইড্রেটের সম্ভাব্য মজুতের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। সমুদ্রতলের উচ্চ চাপ ও নিম্ন তাপমাত্রায় তৈরি এই মিথেন গ্যাস হাইড্রেটকে সাধারণভাবে ‘ফায়ার আইস’ বলা হয়। উন্নত প্রযুক্তিসম্পন্ন কিছু দেশই বর্তমানে এই ধরনের গ্যাস হাইড্রেট আহরণের সক্ষমতা অর্জন করেছে।
এদিকে বঙ্গোপসাগরের সম্ভাবনার এই ইঙ্গিতকে আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে, কারণ ভারতের কৃষ্ণা-গোদাবরী অববাহিকায় মিথেন হাইড্রেট উত্তোলনের প্রস্তুতি ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘আরভি সোনে’ জাহাজের গবেষণা প্রতিবেদন সংগ্রহ ও পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থলভাগ ও সমুদ্রের গভীরে অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করতে আধুনিক রিগ ও প্রযুক্তির উন্নয়ন জরুরি। বাপেক্সকে আরও শক্তিশালী করে গভীর অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে জাপান ও চীনের মতো দেশের প্রযুক্তিগত সহায়তায় সমুদ্রতল থেকে গ্যাস হাইড্রেট আহরণের প্রস্তুতি গ্রহণের কথাও উঠে এসেছে। বিদ্যমান গ্যাসক্ষেত্রগুলোর গভীর স্তরে পুনরায় অনুসন্ধান চালানোর দায়িত্বও বাপেক্সকে দেওয়া উচিত বলে মত দেওয়া হয়।
এছাড়া দেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড, যা এখনো পূর্ণাঙ্গ ভূতাত্ত্বিক জরিপের বাইরে রয়েছে, এবং বিশাল সমুদ্রসীমাকে নতুন অনুসন্ধান ব্লকে ভাগ করে কার্যক্রম পরিচালনার সুপারিশ করা হয়। প্রয়োজনে বাপেক্সকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের মতো একটি স্বতন্ত্র ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলা হচ্ছে।
বর্তমান বাস্তবতায় দেশীয় উত্তোলনযোগ্য গ্যাস রিজার্ভ দ্রুত কমে আসায় সময়ক্ষেপণের সুযোগ নেই বলেও মত উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন আর শুধু আলোচনা বা সুপারিশ নয়, বরং জরুরি ভিত্তিতে বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণই সময়ের দাবি।

