মধ্যপ্রাচ্যকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করলেও পরিস্থিতি বড় ধরনের সংঘাতে রূপ না নেওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি অঞ্চলে সামরিক তৎপরতা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আশঙ্কা কিছুটা কমে আসায় বাজারে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
শনিবার (৬ জুন) আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের প্রধান সূচকগুলো নিম্নমুখী অবস্থানে লেনদেন হয়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আগের দিনের ঘটনাপ্রবাহকে অনেকেই সীমিত পরিসরের সংঘাত হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। ফলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা আপাতত কমে এসেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেলে ১ দশমিক ৯৪ ডলার বা ২ দশমিক ০৪ শতাংশ কমে ৯৩ দশমিক ০৯ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের মূল্য ২ দশমিক ৬ শতাংশের বেশি কমে প্রতি ব্যারেল ৯০ দশমিক ৫৪ ডলারে দাঁড়ায়।
শুধু প্রধান দুই ধরনের তেলই নয়, অন্যান্য জ্বালানি পণ্যের বাজারেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। মারবান ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ০২ শতাংশ কমে ৯০ দশমিক ৬৮ ডলারে এবং ওয়েস্টার্ন কানাডিয়ান সিলেক্টের দাম ৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ কমে ৮০ দশমিক ৬৯ ডলারে নেমে আসে। প্রাকৃতিক গ্যাস ও হিটিং অয়েলের দামও কমেছে, যদিও গ্যাসোলিনের দামে সামান্য বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
বাজারে এই পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার সীমিত প্রভাবকে। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে একটি তেলবাহী জাহাজ জব্দ এবং কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করা হয়। পরে উপকূলীয় নজরদারি স্থাপনায় পাল্টা সামরিক অভিযানও পরিচালিত হয়। তবে এসব ঘটনায় বড় ধরনের প্রাণহানি বা দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের লক্ষণ দেখা যায়নি।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরেই হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই পথ ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে পৌঁছে। ফলে এই অঞ্চলে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া আঞ্চলিক সংঘাতের পর থেকেই তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দেয়। সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং অনেক দেশে জ্বালানি ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে অন্তত আপাতত বড় ধরনের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা কমেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি বাজার এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে। যেকোনো সময় নতুন সামরিক উত্তেজনা বা কূটনৈতিক অচলাবস্থা বাজারকে আবারও অস্থির করে তুলতে পারে। তবে বর্তমান দরপতন বিনিয়োগকারীদের একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—তারা এখনই বৃহৎ আকারের যুদ্ধ বা সরবরাহ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা দেখছেন না।
বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য কমে যাওয়া আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য স্বস্তির খবর হতে পারে। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম কমলে পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা থাকে। এখন বাজারের নজর থাকবে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতির দিকে, কারণ সেখানকার যেকোনো পরিবর্তন আগামী দিনগুলোতে তেলের দামের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।

