আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা, ভর্তুকি ব্যয় বৃদ্ধি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ, ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ এবং সরকারি কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ আংশিক বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কারণে সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
এদিকে রোববার শুরু হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন। বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হবে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন হিসেবে এটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামী বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করবেন।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অন্তর্বর্তী সরকার ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছিল, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম ছিল। পরে সংশোধিত বাজেটের আকার দাঁড়ায় ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। সে সময় উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত করে ভর্তুকি ও অনুন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছিল। সেই তুলনায় আগামী বাজেটের আকার প্রায় ১৮ শতাংশ বড় হতে যাচ্ছে। অতীতে সাধারণত বাজেটের আকার ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেত।
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে বহুমাত্রিক চাপের মধ্যে রয়েছে। সামষ্টিক অর্থনীতি, আর্থিক খাত, উৎপাদন ও সামাজিক ক্ষেত্র—সবখানেই চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত দুর্বলতার পাশাপাশি বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাবও অর্থনীতিকে চাপে ফেলেছে। বিশেষ করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব আদায়ে ব্যর্থতা এখন বড় উদ্বেগের বিষয়।
এমন বাস্তবতায় প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে রাজস্ব ও আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে, তা অনেকের কাছে বেশ উচ্চাভিলাষী বলে মনে হচ্ছে। তবে সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এসব পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে আগামী বাজেটের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে রাখা হচ্ছে। তবে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বাজেট ঘাটতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ৮ হাজার কোটি টাকা, সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৯ হাজার কোটি টাকা, বৈদেশিক ঋণ থেকে ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকা এবং ৫ হাজার কোটি টাকার অনুদান সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
ভর্তুকি খাতে খাদ্যের জন্য ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাতে ২৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে মোট দেশজ উৎপাদনের ৩১ দশমিক ৪ শতাংশ বিনিয়োগ অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেসরকারি খাতে ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সরকারি খাতে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য রয়েছে।
আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানির মূল্য সমন্বয় সরকারকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারে। সামাজিক সুরক্ষা খাতে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং বিভিন্ন ভাতা কর্মসূচি অব্যাহত রাখা হবে। পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত আরও ১ হাজার ৮৫৭ জনকে ভাতা কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকারি কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অতিরিক্ত ৩৫ হাজার কোটি টাকা সংরক্ষণের চিন্তাভাবনা রয়েছে। শিক্ষা খাতে ৫০ হাজার ৩০২ কোটি এবং স্বাস্থ্য খাতে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনাও করা হয়েছে।
এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, চলচ্চিত্র, সংগীত, ক্রীড়া এবং গ্রামীণ সংস্কৃতিভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে বিশেষ তহবিল ও প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের আশা, এসব উদ্যোগ অর্থনীতির নতুন খাতগুলোকে আরও গতিশীল করবে এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করবে।

