ঢাকার বনশ্রীর বাসিন্দা তানিয়া রহমানের পরিবারের মাসিক আয়-ব্যয়ের হিসাব তিনিই সামলান। দুই সন্তানের এই জননী গৃহিণী হলেও সংসারের প্রতিটি খরচের দিকে তাকে সতর্ক নজর রাখতে হয়। তার স্বামী একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। বিশেষ করে গ্যাস ও যাতায়াত খরচ বৃদ্ধির কারণে পরিবারের বাজেটে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই কার্যকর হয়েছে বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার। ফলে নতুন মাসে বিদ্যুৎ বিল কত আসবে, তা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন তানিয়া।
তিনি জানান, তাদের বাসায় সাধারণত প্রতি মাসে প্রায় চার হাজার টাকার বিদ্যুৎ বিল আসে। নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পর সেই বিল আরও বাড়তে পারে বলে শুনেছেন। কিন্তু আয় অপরিবর্তিত থাকায় অতিরিক্ত খরচ কীভাবে সামলাবেন, সেটাই এখন তার বড় চিন্তার বিষয়।
তানিয়া রহমানের ভাষায়, বিদ্যুৎ বিল যদি আরও বেড়ে যায়, তাহলে সেই অতিরিক্ত অর্থ কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় আছেন। কারণ পরিবারের আয় বাড়েনি, কিন্তু ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে। শুধু তানিয়া নন, নতুন বিদ্যুৎ মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পর দেশের অনেক আবাসিক গ্রাহকের মনেই একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—মাস শেষে তাদের বিল কতটা বাড়বে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে প্রথমেই জানতে হবে একটি পরিবার মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। কারণ আবাসিক গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিল মূলত ব্যবহৃত ইউনিটের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে নির্ধারণ করা হয়।
তবে গ্রাহকদের জন্য একটি স্বস্তির খবরও রয়েছে। সরকার আবাসিক খাতে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যে অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল, তা প্রত্যাহার করেছে। ফলে কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী গ্রাহকদের ওপর বাড়তি চাপ কিছুটা কমতে পারে।
বিদ্যুৎ বিলের ‘ইউনিট’ আসলে কী?
মাসে কত ইউনিট খরচ হচ্ছে, কীভাবে বুঝবেন:
আপনি মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন, তা জানতে হলে প্রথমেই বিদ্যুৎ মিটারের রিডিং বোঝা জরুরি। এই রিডিং থেকেই আপনার মোট ব্যবহৃত বিদ্যুতের হিসাব পাওয়া যায়। বিদ্যুৎ মিটারের ডিসপ্লেতে সাধারণত মোট ব্যবহৃত বিদ্যুৎ কিলোওয়াট-ঘণ্টা হিসেবে দেখানো থাকে। নতুন মিটার বসানোর সময় শুরুতে রিডিং সাধারণত শূন্য থেকে শুরু হওয়ার কথা।
তবে বাস্তব ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমও দেখা যায়। মিটার পরীক্ষা বা যাচাইয়ের সময় অনেক ক্ষেত্রে ১৫ থেকে ২০ ইউনিট পর্যন্ত রিডিং উঠে যেতে পারে। আবার কোনো মিটার যদি এক জায়গা থেকে খুলে অন্য জায়গায় স্থাপন করা হয়, তখন সেটি শূন্য থেকে শুরু না হয়ে আগের রিডিং নিয়েই চালু হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক সময় শুরুতেই রিডিং ১০ হাজার বা তারও বেশি দেখা যায়। এতে কোনো সমস্যার বিষয় নেই, কারণ সেটিই মোট ব্যবহারের ধারাবাহিক হিসাব।
মাস শেষে আপনার ব্যবহৃত বিদ্যুতের পরিমাণ বের করা হয় বর্তমান রিডিং থেকে আগের মাসের রিডিং বাদ দিয়ে। এই পার্থক্যই হলো আপনার প্রকৃত ইউনিট ব্যবহার। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, গত মাসে মিটারের রিডিং ছিল ১২ হাজার ২০০ ইউনিট। চলতি মাসে তা বেড়ে ১২ হাজার ৫০০ ইউনিট হয়েছে। তাহলে ওই মাসে আপনার বিদ্যুৎ ব্যবহার দাঁড়াবে ৩০০ ইউনিট।
সহজভাবে বলা যায়, গাড়ির ওডোমিটার যেমন গাড়ি কত দূর চলেছে তা দেখায়, বিদ্যুৎ মিটারও তেমনি মোট কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে তার হিসাব রাখে। তবে শুধু মিটারের রিডিং দেখে চূড়ান্ত বিল সবসময় নির্ভুলভাবে অনুমান করা যায় না। কারণ বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে আরও কিছু খরচ যুক্ত থাকে, যেমন মিটার ভাড়া, ভ্যাট ও অন্যান্য নির্ধারিত চার্জ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রিপেইড মিটারের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নতুন ইউনিটভিত্তিক বিদ্যুৎ বিলের হার:
বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণার মাত্র এক দিনের মাথায় আবারও পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।
নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের বাড়তি চাপ থেকে রক্ষা করতে নতুন করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। প্রান্তিক গ্রাহকদের খুচরা বিদ্যুতের মূল্যহার পুনর্বিবেচনার জন্য বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে বিইআরসিকে চিঠি দেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুই শ্রেণির গ্রাহকের ক্ষেত্রে বর্ধিত মূল্যহার প্রত্যাহার করা হয়েছে।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আবাসিক লাইফ লাইন (০ থেকে ৫০ ইউনিট) এবং আবাসিক প্রথম ধাপের গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারে বর্ধিত মূল্য কার্যকর হবে না। আগের মূল্যহারই বহাল থাকবে অর্থাৎ লাইফ লাইন গ্রাহকদের জন্য প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম আগের মতোই ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থাকবে। একইভাবে শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারের ক্ষেত্রে আগের হার ৫ টাকা ২৬ পয়সাই কার্যকর থাকবে। অন্য সব ধাপের গ্রাহকদের ক্ষেত্রে তেসরা জুন বিইআরসি ঘোষিত নতুন মূল্যহারই বহাল থাকবে। নতুন হার অনুযায়ী—
- ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ৫০ পয়সা
- ২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ৫৯ পয়সা
- ৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ৯ টাকা ৬২ পয়সা
- ৪০১ থেকে ৬০০ ইউনিট পর্যন্ত প্রতি ইউনিট ১৫ টাকা ১ পয়সা
- ৬০০ ইউনিটের বেশি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিট ১৭ টাকা ৩৫ পয়সা
এতে দেখা যাচ্ছে, কম ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য কিছুটা স্বস্তি থাকলেও বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে আগের ঘোষিত উচ্চ মূল্যহারই কার্যকর থাকবে। বিদ্যুৎ খাতে এই পরিবর্তনের ফলে মাস শেষে গ্রাহকের বিল কত হবে, তা এখন নির্ভর করবে প্রতিটি পরিবারের মাসিক ইউনিট ব্যবহারের ওপর।
এ মাসে বিদ্যুৎ বিল কত আসবে, জানবেন কীভাবে:
ধরা যাক, এতদিন আপনার মাসিক বিদ্যুৎ বিল গড়ে প্রায় দুই হাজার টাকা আসত। নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ার পর সেই বিল কতটা বাড়বে, তা পুরোপুরি নির্ভর করবে আপনার মাসে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে তার ওপর। কারণ নতুন নিয়মে সবার বিল একভাবে বাড়বে না। যে গ্রাহক যত বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তার ওপর মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও তত বেশি পড়তে পারে।
বিদ্যুৎ বিল হিসাব করতে হলে প্রথমে জানতে হবে মাসে মোট কত ইউনিট ব্যবহার হয়েছে। এরপর মিটারের বর্তমান রিডিং থেকে আগের মাসের রিডিং বাদ দিয়ে সেই ইউনিট নির্ধারণ করা হয়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, আপনি এ মাসে ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছেন। এই ৩০০ ইউনিট একক কোনো হারে গণনা করা হয় না। বরং এটি বিভিন্ন ধাপে ভাগ হয়ে আলাদা আলাদা স্ল্যাবে হিসাব করা হয়।
সহজভাবে বললে, প্রথম ৭৫ ইউনিটের বিল প্রথম স্ল্যাব অনুযায়ী, এরপরের ১২৫ ইউনিট দ্বিতীয় স্ল্যাব অনুযায়ী এবং শেষ ১০০ ইউনিট তৃতীয় স্ল্যাব অনুযায়ী গণনা করা হয়। অর্থাৎ, পুরো ইউনিটের জন্য একক দাম প্রযোজ্য নয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কোনো গ্রাহক ৭৫ ইউনিট ছাড়িয়ে গেলেই তার বিল মাল্টিপল স্ল্যাবে গণনা করা হবে। তার ভাষায়, আগে যে বিল দুই হাজার টাকা আসত, নতুন নিয়মে সেটি বেড়ে আড়াই হাজার টাকার কাছাকাছি যেতে পারে। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ ব্যবহার যত বাড়বে, বিলও সেই অনুপাতে বাড়বে, তবে নির্দিষ্ট ধাপ অনুযায়ী।
আরও একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, যদি কেউ ২০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, আগে যেখানে তার বিল প্রায় এক হাজার টাকা আসত, নতুন ব্যবস্থায় তা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে প্রায় এক হাজার ২০০ টাকার মতো হতে পারে।
প্রিপেইড মিটারে কি বিদ্যুৎ বিল বেশি আসে?
দেশে বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব রাখার জন্য মূলত দুই ধরনের মিটার ব্যবহৃত হয়—প্রিপেইড এবং পোস্টপেইড। এই দুই ব্যবস্থার মূল পার্থক্য হলো বিল পরিশোধের পদ্ধতিতে। পোস্টপেইড মিটারের ক্ষেত্রে গ্রাহক আগে বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। মাস শেষে মিটারের রিডিং অনুযায়ী বিল তৈরি করা হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেই বিল পরিশোধ করতে হয়। এই ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা নির্দিষ্ট সময় পর মিটারের তথ্য সংগ্রহ করে বিল নির্ধারণ করে।
অন্যদিকে, প্রিপেইড মিটারে আগে টাকা রিচার্জ করতে হয়। সেই রিচার্জকৃত ব্যালেন্স থেকেই ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। মিটারের ডিসপ্লেতে সাধারণত অবশিষ্ট ব্যালেন্স, ব্যবহৃত ইউনিটসহ বিভিন্ন তথ্য দেখা যায়। ব্যালেন্স কমে গেলে অনেক ক্ষেত্রে মিটার সতর্ক সংকেতও দেয়। তবে মিটার যেটাই হোক না কেন, বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণ হয় মূলত ব্যবহৃত ইউনিটের ভিত্তিতেই। অর্থাৎ, প্রিপেইড বা পোস্টপেইড—দুই ক্ষেত্রেই খরচের মূল হিসাব একই কাঠামোয় করা হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা রয়েছে যে সেখানে বেশি টাকা কাটা হয়, কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। তার ভাষায়, প্রিপেইড ব্যবস্থায় রিচার্জ করার সময়ই ভ্যাট কেটে নেওয়া হয়। অন্যদিকে পোস্টপেইড ব্যবস্থায় মাস শেষে ব্যাংকের মাধ্যমে সেই পরিশোধ সম্পন্ন হয়। তিনি আরও জানান, প্রিপেইড মিটারের যে মাসিক চার্জ ছিল, সেটিও বর্তমানে সমন্বয় বা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির পেছনের কারণ:
বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে সরকারের হাতে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিনের ভর্তুকি ও আর্থিক চাপ সামাল দিতেই এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সরকারের জন্য প্রায় বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। তিনি দাবি করেন, এর বড় একটি অংশ আগের সরকারের সময় তৈরি হওয়া নীতিগত সমস্যার ফল, আর পরবর্তী সময়ে ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগও যথেষ্ট ছিল না। তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ খাতে আমদানি নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় চাপ আরও বাড়ছে। এর ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান দুর্বল হলে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির চাপ ক্রমেই বাড়ছে এবং বাস্তব ব্যয় অনেক সময় বাজেটের নির্ধারিত সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, নীতিগত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের সুরক্ষাকে। লাইফলাইন ও প্রান্তিক পর্যায়ের গ্রাহকদের যাতে অতিরিক্ত চাপ না পড়ে, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তার ভাষায়, দেশের মোট গ্রাহকের বড় একটি অংশই নিম্ন আয়ের, তাই তাদের জন্য আগের মূল্যহার বহাল রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-এর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশের প্রায় চার কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে আড়াই কোটিরও বেশি প্রান্তিক পর্যায়ের। ফলে তাদের ক্ষেত্রে আগের মূল্যহার বহাল থাকায় নতুন দামের প্রভাব অনেকাংশে সীমিত থাকবে।
বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সহজ পদ্ধতি কী?
বিদ্যুতের দাম ও বিল নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ার এই সময়ে অনেকেই খুঁজছেন কীভাবে ঘরের দৈনন্দিন ব্যবহারে বিদ্যুৎ খরচ কমানো যায়। কিছু সাধারণ অভ্যাস বদলেই মাসিক বিল উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলোর মধ্যে সাধারণত সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয় এয়ার কন্ডিশনার (এসি), গিজার বা ওয়াটার হিটার, বৈদ্যুতিক চুলা, ওভেন ও ইস্ত্রির মতো যন্ত্রে। অন্যদিকে ফ্যান, এলইডি বাল্ব ও মোবাইল চার্জারের মতো যন্ত্র তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। দৈনন্দিন ব্যবহারে ছোট কিছু অভ্যাস পরিবর্তন করলেই বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা যায়। যেমন—ফ্যান, বাতি, টিভি বা কম্পিউটার ব্যবহার না করলে সেগুলোর সুইচ বন্ধ রাখা উচিত। একই সঙ্গে ইস্ত্রি বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার না থাকলে প্লাগ খুলে রাখলে অতিরিক্ত খরচ কমে।
প্রচলিত বাল্বের পরিবর্তে এলইডি বা এনার্জি সাশ্রয়ী বাতি ব্যবহার করলে বিদ্যুৎ ব্যবহার অনেকটাই কমে আসে। উদাহরণ হিসেবে, যেখানে একটি সাধারণ বাল্ব প্রায় ১০০ ওয়াট বিদ্যুৎ খরচ করে, সেখানে একটি এলইডি বাল্বে খরচ হয় প্রায় ২৫ ওয়াট। এছাড়া এখন বাজারে ইনভার্টার প্রযুক্তির ফ্রিজ, এসি ও ওয়াশিং মেশিন পাওয়া যায়, যেগুলো তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিল কমাতে সহায়তা করে।
এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম মানলে খরচ কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখলে বিদ্যুৎ খরচ নিয়ন্ত্রণে থাকে। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ঘর ঠাণ্ডা হয়ে গেলে এসি বন্ধ করে ফ্যান চালানো যেতে পারে। বিদ্যুৎ খরচ শুধু যন্ত্রের ওপরই নয়, ঘরের বৈদ্যুতিক সংযোগের মানের ওপরও নির্ভর করে। নিম্নমানের তার বা দুর্বল সংযোগ অনেক সময় অতিরিক্ত লোড সৃষ্টি করে, যা খরচ বাড়াতে পারে। বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে পুরোনো সাব-স্টেশন বা বৈদ্যুতিক অবকাঠামোও বেশি বিদ্যুৎ খরচের একটি কারণ হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন, বছরে অন্তত একবার বাসার বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা উচিত। এসি ও ফ্রিজের ফিল্টার নিয়মিত পরিষ্কার করলে সেগুলো কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে।
রান্নার ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে। মাইক্রোওয়েভ বা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ-নির্ভর যন্ত্রের পরিবর্তে গ্যাস চুলা বা কম বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী যন্ত্র ব্যবহার করলে খরচ কমে। সবশেষে, দিনের আলো কাজে লাগানোর অভ্যাসও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দিনের বেলায় অপ্রয়োজনে বাতি না জ্বালালে মাসিক বিদ্যুৎ বিল অনেকটাই কমানো সম্ভব।

