স্ট্যাম্প শুল্ক আদায় ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিতে বড় ধরনের সংস্কার শুরু করেছে সরকার। এর মূল লক্ষ্য হলো জালিয়াতি বন্ধ করা, রাজস্ব সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও সহজ করা।
পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী জুলাই থেকে আংশিকভাবে এবং পরবর্তী অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে দেশের সব ধরনের স্ট্যাম্প শুল্ক বাধ্যতামূলকভাবে অনলাইনভিত্তিক ‘এ-চালান’ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে ধাপে ধাপে কাগজের স্ট্যাম্প ও আঠালো স্ট্যাম্পের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. আবদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্ট্যাম্প শুল্ক আদায়ে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘদিনের জালিয়াতির সুযোগ বন্ধ করা।
বর্তমানে ১৮৯৯ সালের স্ট্যাম্প আইনের আওতায় আঠালো ও কাগজের স্ট্যাম্পের মাধ্যমে শুল্ক আদায় করা হয়। তবে এই ব্যবস্থায় জাল স্ট্যাম্প তৈরি, নকল কাগজ ব্যবহার এবং হিসাবের গরমিলের মতো সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে রয়েছে। এ ছাড়া স্ট্যাম্প ছাপানো, সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ও সারাদেশে বিতরণ—সব মিলিয়ে প্রক্রিয়াটি ব্যয়বহুল এবং সময়সাপেক্ষ বলেও মনে করছে সরকার।
রাজস্ব ঘাটতির চিত্র:
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই খাত থেকে বড় অঙ্কের রাজস্ব পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও জালিয়াতির কারণে লক্ষ্য অনুযায়ী আয় হচ্ছে না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য থাকলেও আদায় হয়েছে ৩ হাজার ৮৬০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকা। তবে প্রথম চার মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ১ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা।
খসড়া প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক বছর সময়কালে বীমা স্ট্যাম্পসহ সব ধরনের নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প শুল্ক ‘এ-চালান’ এবং প্রচলিত কাগজ—উভয় মাধ্যমেই পরিশোধ করা যাবে। তবে ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে শুধুমাত্র ‘এ-চালান’ ব্যবস্থাই বাধ্যতামূলক হবে।
নতুন নিয়মে কী পরিবর্তন আসছে:
নতুন ব্যবস্থায় শুল্ক পরিশোধের পর পাওয়া চালানের একটি মুদ্রিত কপি মূল দলিলের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। দলিলের প্রথম পাতায় সংশ্লিষ্ট চালান নম্বর উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক থাকবে।
এ ছাড়া সাধারণ কাগজ বা আইন মন্ত্রণালয় অনুমোদিত লিগ্যাল পেপার ব্যবহার করা যাবে। স্ট্যাম্প পেপারের পরিবর্তে এই কাগজ ব্যবহারের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। যদি কেউ একাধিক ব্যক্তির পক্ষে শুল্ক পরিশোধ করেন, তাহলে চালানে প্রত্যেকের নাম ও জাতীয় পরিচয়পত্র, কর শনাক্তকরণ নম্বর বা ব্যবসায়িক পরিচয় নম্বর আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হবে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বিভিন্ন দপ্তর নতুন ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। নিবন্ধন অধিদপ্তর জানিয়েছে, দলিল নিবন্ধন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত শুল্কের অর্থ ‘স্থগিত’ অবস্থায় রাখার ব্যবস্থা করা হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিদ্যমান আইবাস প্লাস প্লাস ব্যবস্থার মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে কোনো কারিগরি বাধা নেই। অন্যদিকে, জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও ফার্মস নিবন্ধন অধিদপ্তর জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি থেকে কোম্পানি নিবন্ধন ও শেয়ার হস্তান্তরের শুল্ক সফলভাবে এ-চালানের মাধ্যমে আদায় করা হচ্ছে।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি জানান, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা এই নতুন ব্যবস্থার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। সরকারের মতে, নতুন ব্যবস্থা চালু হলে জাল স্ট্যাম্প তৈরি ও ভুয়া চালানের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে যাবে। একই সঙ্গে স্ট্যাম্প ছাপানো, পরিবহন ও বিতরণ ব্যয় কমবে। কাগজের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে। নতুন ব্যবস্থায় চালানের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা যাবে দ্রুত যাচাইকরণ কোড বা অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে।

