দেশে ৩৭৫ সিসি ইঞ্জিনক্ষমতার মোটরসাইকেল পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানির বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। প্রস্তাবিত নতুন আমদানি নীতি আদেশে এ বিষয়ে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশে ১৬৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানিতে কোনো বাধা নেই। এই সীমার মধ্যে থাকা মোটরসাইকেল পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানি করা যায়, আবার যন্ত্রাংশ এনে দেশে সংযোজন করে উৎপাদনও করা সম্ভব। অন্যদিকে ১৬৫ সিসির বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানি করা এখনো নিষিদ্ধ। তবে ৫০০ সিসি পর্যন্ত ইঞ্জিনক্ষমতার মোটরসাইকেল উৎপাদনের জন্য যন্ত্রাংশ আমদানির সুযোগ রয়েছে।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানির অনুমতি দেওয়া হতে পারে। তবে ৩৭৫ সিসির বেশি ক্ষমতার সব মোটরসাইকেল আমদানি নিষিদ্ধই থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে এই সীমার বাইরে বিশেষ সুবিধা প্রযোজ্য হবে।
বিষয়টি নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে। অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করেই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তাঁর মতে, আমদানি নীতি আদেশ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং চলতি মাসেই এটি জারি হতে পারে। মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সূত্র বলছে, কয়েকটি কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ক্ষমতার মোটরসাইকেল পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানির সুযোগ তৈরির চেষ্টা করছে।
খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, এ সুযোগ কার্যকর হলে নতুন কিছু বিদেশি ব্র্যান্ড দেশে কারখানা না করেই সরাসরি মোটরসাইকেল আমদানি করতে পারবে। একই সঙ্গে কিছু আমদানিকারক কম মূল্য দেখিয়ে কর ফাঁকি দিয়ে উচ্চ ক্ষমতার মোটরসাইকেল আনার সুযোগ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে দেশের ভেতরে যেসব কোম্পানি ইতিমধ্যে কারখানা স্থাপন করেছে, তারা প্রতিযোগিতার চাপে পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। তাদের দাবি, এতে স্থানীয়ভাবে মূল্য সংযোজন ও কর্মসংস্থান বাড়ার পরিবর্তে বৈদেশিক মুদ্রা খরচ বাড়বে। আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কথাও উঠে আসছে। বর্তমানে পুলিশের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের সীমা ১৬৫ সিসি পর্যন্ত। এর বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল বাড়লে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মোটরসাইকেল খাতের কোম্পানিগুলোর সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালের পর দেশে প্রায় ১০টি কারখানা গড়ে উঠেছে। জাপান ও ভারতের পরিচিত ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল এখন দেশে উৎপাদিত হচ্ছে। এসব কারখানায় প্রায় আট হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে।
২০১৮ সালে সরকার মোটরসাইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা গ্রহণ করে। ওই নীতির ওপর ভিত্তি করেই কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করে। তবে বারবার নীতির পরিবর্তনে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
হিরো ব্র্যান্ডের মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বিজয় কুমার মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, নীতির ধারাবাহিকতা না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। তাঁর মতে, পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানির সুযোগ থাকলে নতুন ব্র্যান্ড আনা সহজ হবে, তবে হঠাৎ নীতি পরিবর্তন তিনি সমর্থন করেন না।
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলের অনুমতি দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে তখন শর্ত ছিল, এই ক্ষমতার মোটরসাইকেলের নিবন্ধন পেতে হলে তা দেশে উৎপাদিত হতে হবে। আড়াই বছরের কিছু বেশি সময় পর এখন আবার পুরো তৈরি অবস্থায় আমদানির সুযোগ দেওয়ার আলোচনা চলছে।
এদিকে বাজারেও মন্দাভাব দেখা দিয়েছে। ২০১৮ সালের নীতিতে ২০২৭ সালের মধ্যে দেশে ১০ লাখ মোটরসাইকেল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বর্তমানে বছরে বিক্রি পাঁচ লাখের নিচে।
একটি মোটরসাইকেল বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, অনেক কোম্পানি প্রত্যাশিত মুনাফা করতে পারছে না। এর মধ্যে বারবার নীতি পরিবর্তন বাজারকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। তাঁর মতে, নীতি হওয়া উচিত পুরো খাতকে বিবেচনায় নিয়ে, নির্দিষ্ট কিছু পক্ষের স্বার্থে নয়।

