প্রতি অর্থবছরের শুরুতে সরকার জাঁকজমকপূর্ণভাবে যে আর্থিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করে, বছর শেষে তার বড় একটি অংশই বাস্তবায়নের বাইরে থেকে যায়। দেশের কোন খাতে কত ব্যয় হবে—এই দিকনির্দেশনাই বাজেটের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক সরকারগুলো তাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও এতে তুলে ধরে।
সাম্প্রতিক সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাজেটের আকার আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমানো হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে দেখা যাচ্ছে, প্রতি বছর গড়ে ১৬ থেকে ২২ শতাংশ হারে বাজেটের পরিমাণ বেড়েছে। তারপরও সংশোধন করেও পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের অঙ্ক বাড়লেও এর গুণগত বাস্তবায়নে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হয়নি। তাদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধসহ অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় প্রায় পরিকল্পনা অনুযায়ী হলেও বড় ধরনের ঘাটতি থাকে উন্নয়ন খাতে। সংশোধনের মাধ্যমে বরাদ্দ কমানো হলেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির শতভাগ বাস্তবায়ন সম্ভব হয় না।
সরকারি ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণেই মূলত বাজেটের আকার ক্রমাগত বড় হচ্ছে। ঋণ পরিশোধের চাপ, সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, জ্বালানি খাতে ভর্তুকি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বিস্তারের কারণে ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু এর বিপরীতে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দের অনুপাত তুলনামূলকভাবে কমছে।
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের ৩০ জুন তাজউদ্দিন আহমেদ যে বাজেট ঘোষণা করেছিলেন, তার মোট আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের সেই বাজেটে উন্নয়ন বরাদ্দ ছিল ৫০১ কোটি টাকা।
আগামী ১১ জুন বর্তমান অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী যে বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন, তার আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা।
তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর মোট বাজেটের প্রায় ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ থাকত। কিন্তু আসন্ন বাজেটে এই হার নেমে এসেছে প্রায় ৩২ শতাংশে। শুধু এই বাজেটেই নয়, ১৯৯৫-৯৬ অর্থবছরের পর থেকেই উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ ৫০ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের আকার বড় হলেও কাঙ্ক্ষিত কাঠামোগত পরিবর্তন না হলে বাস্তবায়নের এই ঘাটতি কাটানো কঠিন হবে।
বাজেট বাস্তবায়নে ধারাবাহিক ঘাটতি:
বাংলাদেশের বাজেট বাস্তবায়নের চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের পুরোটা খরচ করা সম্ভব হয় না। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত বরাদ্দের তুলনায় বাস্তব ব্যয় নিয়মিতভাবেই কম থাকছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের মোট বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। তবে বাস্তবায়নের হিসাব বলছে, মূল বাজেটের প্রায় ৮০ শতাংশ এবং সংশোধিত বাজেটের প্রায় ৮৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও একই ধরনের বাস্তবায়ন চিত্র দেখা গেছে।
অর্থ বিভাগের গত ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই বাজেট বাস্তবায়নের হার গড়ে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। অর্থাৎ ঘোষিত বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শেষ পর্যন্ত ব্যয়ই হচ্ছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো দেশের ক্ষেত্রে শতভাগ বাজেট বাস্তবায়ন বাস্তবসম্মত নয়। তবে বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়ন ও বরাদ্দ কাঠামোর দুর্বলতা এই ঘাটতির অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে।
তাদের বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে এলাকার জনসংখ্যা, স্থানীয় চাহিদা এবং বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে বাজেট পরিকল্পনা করা হয় না। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। পাশাপাশি খাতভিত্তিক বরাদ্দেও পরিকল্পনার ঘাটতি স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে, যা সামগ্রিক বাজেট বাস্তবায়নকে প্রভাবিত করছে।
চলতি বাজেট বাস্তবায়নে ধীরগতি:
অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নের গতি তুলনামূলকভাবে ধীর। প্রথম ৯ মাসে (জুলাই থেকে মার্চ) মোট বাজেটের মাত্র ৫২ শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থাৎ, নির্ধারিত বাজেটের প্রায় অর্ধেক অংশ এখনো ব্যয় হয়নি বা বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে।
তবে আগের অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা অগ্রগতি দেখা গেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে বাজেট বাস্তবায়নের হার ছিল মূল বাজেটের ৪৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। সে হিসাবে চলতি অর্থবছরে বাস্তবায়ন হার প্রায় ৪ শতাংশ বেড়েছে। অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন প্রকল্পগুলো পুনর্গঠন করা হচ্ছে এবং বরাদ্দ কাঠামোতেও পরিবর্তন আসছে। সরকারি সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ফলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি বাস্তবায়নে আগামী মাসগুলোতে গতি বাড়বে।

