উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে আরও বাস্তবভিত্তিক ও সংস্কারকেন্দ্রিক করার তাগিদ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, উদ্যোক্তা এবং নীতিনির্ধারকেরা। তাঁদের মতে, করব্যবস্থার আধুনিকায়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, আর্থিক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং কৃষিতে কার্যকর বিনিয়োগ নিশ্চিত না হলে অর্থনীতির টেকসই পুনরুদ্ধার অর্জন করা কঠিন হবে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘সংকট মুহূর্তের বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় এসব মতামত উঠে আসে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চরচা ডটকম এই আলোচনার আয়োজন করে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তারা বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আগামী বাজেটের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন। তাঁদের মতে, বাস্তবসম্মত নীতি ও কার্যকর পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির শক্ত ভিত গড়ে দিতে পারে।
এপেক্স ফুটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসিম মঞ্জুর বলেন, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে হলে কর কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি করপোরেট করের হার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে নীতিগত অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতাকে বিনিয়োগের অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
গবেষক ও অধিকারকর্মী মাহা মির্জা কৃষি খাতে বাজেট বরাদ্দ বর্তমান ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে আধুনিক কৃষিযন্ত্র সহজলভ্য করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষি প্রণোদনা যেন প্রকৃত কৃষকের কাছে পৌঁছে, সে বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সাবেক অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী কর প্রশাসনের পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর, নগদ অর্থের ব্যবহার হ্রাস, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেটের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অতিরিক্ত করের চাপ এবং অগ্রিম আয়কর ব্যবস্থা ব্যবসায়ীদের জন্য নানা ধরনের জটিলতা তৈরি করছে। তিনি করনীতি প্রণয়ন ও কর আদায়ের দায়িত্ব পৃথক প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালনার দাবি জানান।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানান, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার নতুন একটি অর্থনৈতিক মডেল নিয়ে কাজ করছে। এর লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা। তিনি বলেন, ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ ধারণার ভিত্তিতে এমন প্রবৃদ্ধি অর্জনের চেষ্টা চলছে, যার সুফল সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাবে। এ জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো, দেশীয় ও রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষ অতিথি পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি বলেন, দেশে দুর্নীতির পাশাপাশি সম্পদের অপচয়ও একটি বড় সমস্যা। তিনি উদাহরণ হিসেবে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল নির্মাণ করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির অভাবে সেগুলো প্রত্যাশিত সেবা দিতে পারছে না। তাঁর মতে, অপচয় রোধ করা না গেলে টেকসই উন্নয়ন অর্জন সম্ভব হবে না।
চরচার সম্পাদক সোহরাব হাসানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই আলোচনায় পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাশরুর রিয়াজ, ব্যবস্থাপনা হিসাববিদদের প্রতিষ্ঠান আইসিএমএবি’র সভাপতি কাউসার আলম, বিকাশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কামাল কাদীর, চরচার নির্বাহী সম্পাদক সেলিম খানসহ বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

