আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শুল্ক, কর ও ভ্যাট কাঠামোয় বিভিন্ন পরিবর্তনের ফলে চাল, ডাল, চিনি, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি পাউরুটি, বিস্কুট, চিপস ও ফলের রসের মতো খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে চিকিৎসা, যাতায়াত, শিক্ষা উপকরণ এবং প্রযুক্তিপণ্যের খরচও বাড়তে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের আমদানি পর্যায়ে বিদ্যমান উৎসে কর কমানো হলেও তা পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হচ্ছে না। ফলে আমদানিকারকরা করের বিষয়টি দেখিয়ে বাজারে উচ্চমূল্য বজায় রাখার সুযোগ পেতে পারেন।
প্রস্তাবিত বাজেটে তামাকজাত পণ্যের দাম বাড়ার ইঙ্গিত রয়েছে। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বৃদ্ধির কারণে দেশীয়ভাবে উৎপাদিত ঘড়ি ও চশমার দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির কারণে বিদেশি ঘড়ি ও চশমাও আরও ব্যয়বহুল হবে। বিদেশি ব্র্যান্ড ও সাধারণ প্রসাধনী, আমদানি করা গুঁড়া দুধ, মাছ এবং শুকনো ফলের দামও বাড়তে পারে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো মাছ ও পোলট্রি ফিডের দাম কমানোর দাবি জানালেও সেই দাবির প্রতিফলন বাজেটে দেখা যাচ্ছে না। মানবিক কারণে কিডনি ডায়ালাইসিসের খরচ কমানোর সুপারিশও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। ওষুধ উৎপাদনের কাঁচামালে ছাড় না থাকায় ওষুধের দামও কমছে না। জমি নিবন্ধনের ব্যয়ও অপরিবর্তিত থাকছে।
সাবেক এনবিআর চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদের মতে, সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ইতোমধ্যে এক লাখ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। একদিকে সরকারের আর্থিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষ মূল্যবৃদ্ধির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে মানুষ খরচ কমার আশা করলেও বাস্তবে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনীতিবিদ মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি এবং নতুন অর্থবছরে ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি—এই দুটি কারণই মূল্যস্ফীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচে গিয়ে পড়বে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, করদাতার সংখ্যা ও রাজস্বের আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে সরকারের আয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নতুন নতুন খাতকে অর্থনীতির আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
প্রযুক্তি খাতেও আসছে পরিবর্তন। দেশীয় কম্পিউটার শিল্পকে উৎসাহ দিতে আমদানিনির্ভর কম্পিউটার ও ল্যাপটপের ওপর নিরুৎসাহমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ফলে বাজেট কার্যকর হলে আমদানি করা কম্পিউটার ও ল্যাপটপের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে মোবাইল ফোন ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশ আমদানির খরচও বাড়বে। এর ফলে মোবাইল ফোনের দাম এবং মেরামত ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে।
মোটরসাইকেল খাতেও পরিবর্তন আসছে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সম্পূর্ণ আমদানিকৃত মোটরসাইকেলের ওপর শুল্ক বাড়ানো হলে এসব মোটরসাইকেলের বাজারমূল্য বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া প্লাস্টিকজাত পণ্য, সৌন্দর্যসেবা এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনে যাতায়াতের খরচও বাড়তে পারে।
অটোরিকশার যন্ত্রাংশ আমদানিতে সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এর সরাসরি প্রভাব পড়বে অটোরিকশার বাজারদামে। ছোট ব্যবসার ক্ষেত্রেও নতুন চাপের আশঙ্কা রয়েছে। প্রায় ৩০ লাখ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির আওতাভুক্ত ছোট দোকানগুলোর একটি বড় অংশকে ভ্যাটের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ছোট দোকানগুলোর ওপর বছরে এক হাজার টাকা ভ্যাট আরোপ করা হতে পারে।
সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, পাড়া-মহল্লা ও গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ ছোট দোকান সীমিত আয়ের মানুষের জীবিকার উৎস। এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন ভ্যাটের চাপ সৃষ্টি হলে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হতে পারেন।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, নয় লাখ কোটি টাকার বেশি আকারের বাজেট বাস্তবায়নের জন্য সরকারের রাজস্ব আহরণ বাড়াতে হবে। ফলে বিভিন্ন খাতে নতুন শুল্ক, কর ও ভ্যাট আরোপের প্রবণতা দেখা যেতে পারে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিতে পারে। বিনোদন খাতেও ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী স্টেডিয়ামে খেলা দেখা বা থিয়েটারে নাটক উপভোগের জন্য আগের তুলনায় বেশি মূল্য দিয়ে টিকিট কিনতে হতে পারে।
তুলা আমদানির ক্ষেত্রেও নতুন নীতি আসছে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে তুলা আমদানির খরচ বাড়লেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে বিশেষ সুবিধা রাখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক অঙ্গীকারের কারণে এই সুবিধা দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
শিল্প খাতের বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতেও নিরুৎসাহমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, লোহার রড, স্ক্র্যাপ, বস্ত্রশিল্প, চামড়াশিল্প ও পাটশিল্পের কিছু কাঁচামালের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে দেশীয় গরুর দুধ, মসলা এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত খেলনার দাম বাড়ার সম্ভাবনা নেই।
অন্যদিকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য স্বস্তির খবরও রয়েছে। সফটওয়্যার উন্নয়ন, ওয়েবসাইট সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি সহায়তা, কল সেন্টার, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন ডিজিটাল সেবার ওপর নতুন রাজস্ব আরোপের প্রস্তাব থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর এসব খাতে অতিরিক্ত কর আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা হয়েছে।

