দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে জাতীয় বাজেটে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশবাদী, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
তাঁদের মতে, সৌর ও বায়ুশক্তির বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও উচ্চ কর, নীতিগত অসামঞ্জস্য এবং অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশ নবায়নযোগ্য জ্বালানির নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে পিছিয়ে রয়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর গ্রিন লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত ‘জ্বালানি নিরাপত্তায় নবায়নযোগ্য উৎস: চাই বাজেটের নীতিগত পরিবর্তন’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়।
এই আয়োজন করে উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (ক্লিন) এবং বাংলাদেশের প্রতিবেশ ও উন্নয়ন কর্মজোট (বিডব্লিউজিইডি)। সহ-আয়োজক হিসেবে ছিল বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতি (বেলা), ইথিক্যাল ট্রেডিং ইনিশিয়েটিভ বাংলাদেশ (ইটিআই), ল-ইয়ার্স ফর এনার্জি, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (লিড) এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে জলবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির মোট স্থাপিত সক্ষমতা এক হাজার ৬৭৯ মেগাওয়াট। অথচ সৌর ও বায়ুশক্তি থেকে প্রায় এক লাখ ৩২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর ২৭ শতাংশ থেকে ৬১ শতাংশ পর্যন্ত কর ও শুল্ক আরোপ থাকায় খাতটির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ক্লিনের প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদী বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা অব্যাহত রাখার পরিবর্তে আসন্ন জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রয়োজনীয় নীতিগত সংস্কার, কর ও শুল্ক অব্যাহতি এবং আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত না হলে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ব্যয় ও আমদানিনির্ভরতার চক্রে আটকে পড়বে।
বাংলাদেশ সোলার অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআরইএ)-এর সভাপতি মোস্তফা আল মাহমুদ বলেন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয়। সরকার কর ও শুল্ক কমিয়ে সৌর ও বায়ুশক্তিতে বিনিয়োগ সহজ করলে জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
লিডের গবেষণা পরিচালক অ্যাডভোকেট শিমনউজ্জামান বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য ও বাস্তব বিনিয়োগের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। এই ফারাক কমাতে বাজেটে শক্তিশালী নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা জরুরি।
ইটিআই বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর উদ্দিন শামীম বলেন, জ্বালানি সার্বভৌমত্ব এখন জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। শিল্প খাত এবং ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বাজেটে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
বক্তাদের দাবি, বর্তমানে সৌর প্যানেল ও ইনভার্টারের ওপর প্রায় ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ কর আরোপ রয়েছে। অন্যদিকে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সুবিধা অব্যাহত আছে। এতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তির ব্যয় বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
তাঁরা আরও বলেন, প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ বছরে প্রায় তিন কোটি ১১ লাখ টাকার জ্বালানি আমদানি সাশ্রয় করতে পারে এবং এক হাজার ১৮০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে সক্ষম। এছাড়া প্রতি কিলোওয়াট ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বছরে প্রায় ৩১ হাজার টাকা সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারে।
সংবাদ সম্মেলন থেকে আসন্ন জাতীয় বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—আগামী ১০ বছরের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জামের ওপর কাস্টমস শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর এবং অগ্রিম করসহ সব ধরনের কর ও শুল্ক প্রতীকী এক শতাংশে নামিয়ে আনা।
এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থায়নে ২৫ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ আবর্তনশীল তহবিল গঠনের দাবি জানানো হয়, যাতে উদ্যোক্তারা পাঁচ শতাংশের কম সুদে ঋণ পেতে পারেন।

