বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সৌরবিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক কর সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, সরঞ্জাম আমদানি এবং বিনিয়োগে একাধিক প্রণোদনা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র বলছে, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে বিদ্যমান শুল্ক ও করহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর চিন্তা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়কর অব্যাহতি এবং ব্যবহারকারীদের জন্য কর রেয়াতের সুযোগও রাখা হতে পারে।
বর্তমানে সোলার প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি, ডিসি কেবলসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আমদানিতে ২৫ থেকে ৮৯ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক-কর দিতে হয়। নতুন বাজেটে এসব পণ্যের ওপর করহার কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কর অব্যাহতির ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুনের পর অর্জিত আয়ের ওপর কর ছাড় দেওয়া হবে এবং তা ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। তবে এ সুবিধা পেতে প্রকল্প সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি নেট মিটারিং অনুমোদন এবং বিদ্যুৎ বিক্রির ক্ষেত্রে পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট (পিপিএ) থাকা বাধ্যতামূলক হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিদ্যমান কর সুবিধার মেয়াদ ২০৩০ সালের পরিবর্তে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে বিনিয়োগ করলে প্রথম পাঁচ বছর কোনো আয়কর দিতে হবে না। এরপরের তিন বছর ৫০ শতাংশ এবং পরবর্তী দুই বছর ২৫ শতাংশ কর ছাড় পাওয়া যাবে।
এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এসব পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে। এতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় কমবে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরও আগ্রহী হবে।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাত এখনও আমদানিনির্ভর। প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয় এলএনজি, কয়লা, ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল আমদানিতে। বৈশ্বিক বাজারে দামের ওঠানামা কিংবা ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এ নির্ভরশীলতাকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। অন্যদিকে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং নতুন অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ফলে বিদ্যুতের চাহিদাও ক্রমাগত বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে উদ্যোক্তাদের মতে, উচ্চ শুল্ক ও করহার এখনও এ খাতের অন্যতম প্রধান বাধা। এতে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ছে এবং নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউএবল এনার্জি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তাফা আল মাহমুদ বলেন, সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারকে এ খাতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাঁর মতে, অন্তত পাঁচ বছরের জন্য সৌরবিদ্যুৎ খাতের সব ধরনের শুল্ক ও কর প্রত্যাহার করা গেলে শিল্প খাতে এর ব্যবহার দ্রুত বাড়বে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ ব্যয় ও কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, বড় আকারের সৌর প্রকল্পে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি হলেও পেমেন্ট সিকিউরিটি, নীতিগত স্থিতিশীলতা, প্রকল্প বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তা এবং অর্থায়নসংক্রান্ত ঝুঁকি এখনও তাদের উদ্বেগের কারণ।
এদিকে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতেও নতুন বাজেটে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। বর্তমানে ইভি আমদানিতে প্রায় ৯০ শতাংশ কর রয়েছে। এনবিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ করহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হতে পারে। পাশাপাশি দেশে বৈদ্যুতিক যান উৎপাদন উৎসাহিত করতে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক সুবিধা এবং ভ্যাট ও আয়করে ছাড় দেওয়ার বিষয়ও বিবেচনায় রয়েছে।

