দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করতে দীর্ঘমেয়াদি নানা উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। এর অংশ হিসেবে ২০৩১ সালের মধ্যে ৫৮টি নতুন কূপ খনন ও পুরোনো কূপ সংস্কারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের মজুদ সক্ষমতা বাড়িয়ে ৯০ দিনের চাহিদা পূরণের উপযোগী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
জাতীয় সংসদে গাজীপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য এ. কে. এম. ফজলুল হক মিলনের এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ এ তথ্য জানান। ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বিভিন্ন কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন।
মন্ত্রী জানান, ২০২৮ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে ৫৮টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কার্যক্রম সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চলমান সাইসমিক জরিপ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নতুন সম্ভাবনাময় স্থানের নির্বাচন করা হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে ১ হাজার ৫০০ হর্সপাওয়ার ক্ষমতার নতুন রিগ সংগ্রহ, পরীক্ষা ও চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
সমুদ্রাঞ্চলে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানেও জোর দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে গভীর সমুদ্রের ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রের ১১টিসহ মোট ২৬টি ব্লকে অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২৪ মে ২০২৬ তারিখে অফশোর বিডিং রাউন্ডের নোটিশ প্রকাশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দ্বিমাত্রিক ও ত্রিমাত্রিক সাইসমিক জরিপ এবং নতুন গ্যাসকূপ খননের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি স্থলভাগের কিছু এলাকায়ও নতুন বিডিং রাউন্ড আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে কক্সবাজারের মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং মহেশখালীতে একটি স্থলভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সিস্টেম লস কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গ্যাস পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে নতুন পাইপলাইন স্থাপন করা হবে। এছাড়া বরিশাল-আমিনবাজার-খুলনা, ফেনী-বেগমগঞ্জ এবং মহেশখালী-বাখরাবাদ তৃতীয় সমান্তরাল গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
জ্বালানি তেলের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বিভিন্ন অবকাঠামোগত প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে রয়েছে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং প্রকল্প, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী পাইপলাইন, চট্টগ্রাম-ঢাকা জ্বালানি তেল পরিবহন পাইপলাইন এবং পিতলগঞ্জ থেকে কুর্মিটোলা এভিয়েশন ডিপো পর্যন্ত জেট জ্বালানি পরিবহন পাইপলাইন।
মন্ত্রী জানান, গত ২৫ বছরে দেশে জ্বালানি তেলের মজুদ সক্ষমতা প্রায় ৬ লাখ ৯৪ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ১৫ লাখ ৭২ হাজার ৫০৩ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। বর্তমানে এই সক্ষমতাকে ৯০ দিনের চাহিদা পূরণের উপযোগী করতে কাজ চলছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ১৯ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টন মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দেশের একমাত্র তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের সক্ষমতা বাড়ানোর কাজও এগিয়ে চলছে। বছরে ১৫ লাখ মেট্রিক টন শোধন ক্ষমতার সঙ্গে অতিরিক্ত ৩০ লাখ মেট্রিক টন সক্ষমতা যুক্ত করার লক্ষ্যে আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। বর্তমানে এ প্রকল্পের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
জ্বালানি তেল আমদানির উৎস আরও বৈচিত্র্যময় করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের চুক্তি, আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আমদানির উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সরকারের মতে, টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অংশ হিসেবেই এসব দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

