শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র ইস্যু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। গত মাসে অর্থ বিভাগের নগদ ও ঋণ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী বছরের শুরুতেই এ সঞ্চয়পত্র বাজারে আনা হতে পারে।
রাজস্ব আয় দিয়ে পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় পুরোপুরি মেটানো সম্ভব না হওয়ায় প্রতি বছরই দেশি ও বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিতে হয় সরকারকে। এর মধ্যে দেশীয় ঋণের বড় অংশ আসে ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব বিলের সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় সরকারের সুদ ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের অংশ হিসেবে শরিয়াহভিত্তিক ট্রেজারি বিল ও সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে অর্থ বিভাগ।
চলতি অর্থবছরে ২০ হাজার কোটি টাকার স্বল্পমেয়াদি ইসলামিক ট্রেজারি বিল ইস্যুর পরিকল্পনাও রয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরেও একই কমিটির সভায় এ ধরনের বিল ইস্যুর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় এবার শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার নির্ধারণের জন্য একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে মুনাফার হার নির্ধারণের পর আনুষ্ঠানিকভাবে সঞ্চয়পত্র ইস্যু করা হবে।
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা। মার্চ পর্যন্ত সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে সরকারের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ৮০৪ কোটি টাকায়।
বিশ্বের বহু দেশে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক পণ্যের বড় বাজার গড়ে উঠলেও বাংলাদেশে এটি এখনো সীমিত। দেশে মূলত ইসলামী ধারার ব্যাংকগুলোতে এ ধরনের আমানত রাখা হয়। পাশাপাশি এখন পর্যন্ত ছয়টি ইসলামী বন্ড বাজারে এসেছে, যেগুলোর প্রতিটিতেই কয়েক গুণ বেশি আবেদন পাওয়া গেছে। একটি বন্ড ইস্যুর পর আরেকটি ইস্যু করতে প্রায় এক বছর সময় লেগে যায়। এই সময়ের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের শরিয়াহভিত্তিক খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত থাকে।
গত মাসে গ্রামীণ সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণের জন্য ইসলামী বন্ডের মাধ্যমে ৫ হাজার ৯০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে সরকার। ওই নিলামে মোট আবেদন আসে ৭২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার, যা নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় ১২ দশমিক ৩০ গুণ বেশি।
প্রথমবারের মতো এই নিলাম বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। সাত বছর মেয়াদি ভাড়াভিত্তিক এই বন্ডে বিনিয়োগকারীরা বছরে ১০ দশমিক ৪০ শতাংশ হারে মুনাফা পাবেন। এতে ইসলামী ব্যাংক, প্রচলিত ব্যাংকের ইসলামী শাখা, ব্যক্তি বিনিয়োগকারী ও বিভিন্ন প্রভিডেন্ট ফান্ড অংশ নেয়। চাহিদা বেশি হওয়ায় আনুপাতিক হারে বিনিয়োগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তাদের মতে, দেশে শরিয়াহভিত্তিক আর্থিক পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পণ্য না থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী তাদের সঞ্চয় বিনিয়োগ করতে পারছেন না। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই নতুন সঞ্চয়পত্র চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী বছরের শুরুতেই শরিয়াহভিত্তিক সঞ্চয়পত্র চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

