উচ্চ মূল্যস্ফীতির লাগাতার চাপে নিত্যদিনের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষের জন্য। সংসার চালাতে এখন বাড়তি ব্যয় বহন করতে হচ্ছে প্রতিটি পরিবারকে। চাল, ডাল, আটা, ময়দা, তেল, শাকসবজি থেকে শুরু করে মাংস—সব ধরনের নিত্যপণ্যের দামই আগের তুলনায় বেড়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। অনেকেই বাধ্য হয়ে ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছেন।
গত দুই মাসে অকটেন ও পেট্রলসহ জ্বালানি তেলের দাম দুই দফা বেড়েছে। পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিদ্যুতের দামও বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে সীমিত আয়ের মানুষের মধ্যে। সর্বশেষ মে মাসে মূল্যস্ফীতি ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। অর্থনীতিবিদদের মতে, আসন্ন বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন ও হিসাব বিভাগে কর্মরত আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, তিন বছরে তার বেতন বেড়েছে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা। কিন্তু একই সময়ে সংসার খরচ বেড়েছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। বর্তমানে তার মাসিক আয় ৪৫ হাজার টাকা। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে চার সদস্যের সংসারে এখন আর সঞ্চয় হয় না, বরং মাস শেষে ধারদেনা করে চলতে হচ্ছে। তার মতোই বহু মধ্যবিত্ত পরিবার এখন একই সংকটে পড়েছে।
টানা চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে। বিশেষ করে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে রয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ভবিষ্যতে ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ অবস্থায় বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। তাই বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ইউক্রেন যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তাসহ নানা কারণে দেশে চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। আগের সরকারের সময়ে বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায়নি বলে সমালোচনা রয়েছে। পরে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কিছু উদ্যোগে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো সাড়ে ৮ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
আগামী বাজেটে সরকার মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সাড়ে ৭ শতাংশ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নেওয়ার প্রবণতা এবং অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধি এই লক্ষ্য অর্জনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশে, যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে এটি ৯ শতাংশের নিচে থাকলেও পরবর্তী মাসগুলোতে একাধিকবার ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি প্রায় পুরো সময়ই ৯ শতাংশের ওপরে ছিল।
গত এক বছরে চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, মাংস ও শাকসবজিসহ প্রায় সব ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। ট্রেডিং করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, মোটা চালের দাম এক বছরে প্রায় ৫ শতাংশ বেড়ে কেজিপ্রতি ৫২ থেকে ৫৬ টাকায় পৌঁছেছে। মাঝারি মানের চালের দামও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪ থেকে ৬৮ টাকা। সরু চালের দাম এখন ৭০ থেকে ৮৫ টাকা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মূল্যস্ফীতিতে এককভাবে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে চাল, যার অবদান প্রায় ২০ শতাংশ।
শাকসবজির বাজারেও চাপ অব্যাহত রয়েছে। শীতকালেও অনেক সবজির দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকার নিচে নামেনি। বর্তমানে বেগুন, করলা, কাঁকরোল, ঢ্যাঁড়স, পটোল, চিচিঙ্গা, ধুন্দল, ঝিঙে, বরবটি—সবই ৭০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে।
ভোজ্যতেল বাজারও অস্থির ছিল দীর্ঘ সময়। সরবরাহ সংকটের কারণে কয়েক মাস ২০০ টাকার বেশি দামে তেল বিক্রি হয়েছে। পরে সরকার দাম সমন্বয় করলে বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৯৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এক বছরে এর দাম প্রায় ১০ টাকা বেড়েছে। খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দামও ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘ সময় উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলতে থাকলে টাকার মান কমে যায়, আমদানি ব্যয় বাড়ে এবং অর্থনীতিতে নতুন চাপ তৈরি হয়। বাজেটের আকারও বাড়ছে, যা টাকার প্রবাহ আরও বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ কঠিন হলে সরকার ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে, যা বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমিয়ে অর্থনৈতিক গতি বাধাগ্রস্ত করবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে মজুরির হার কখনোই মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। মে মাসে সর্বোচ্চ মজুরির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ। ফলে বাস্তবে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। গ্রাম ও শহরের ১৪৫টি নিম্ন দক্ষতার পেশার ভিত্তিতে এই হিসাব করা হয়। দেশে প্রায় ৮৬ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন, যাদের আয় অনিশ্চিত ও সীমিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে কঠোর নজরদারি, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ভর্তুকি বাড়ানো ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। পাশাপাশি দরিদ্র মানুষের জন্য নগদ ও খাদ্য সহায়তা বাড়ানো জরুরি।

